আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

শ্রামণের প্রব্রজ্যাবিধি

আগের দুটো পোস্টে লিখেছিলাম কাদেরকে প্রব্রজ্যা দেয়া অনুচিত কিন্তু দিলেও সমস্যা নেই এবং কাদেরকে প্রব্রজ্যা দেয়া একদম নিষিদ্ধ। এবার এখানে শ্রামণের প্রব্রজ্যা কীভাবে দিতে হয় সেব্যাপারে মহাবর্গ, তার অর্থকথা ও টীকা মিলিয়ে এই লেখা লিখলাম। এটা প্রব্রজ্যার ক্ষেত্রে রেফারেন্স হিসেবে রেখে দিতে পারেন।
মহাবর্গ অর্থকথায় (মহা.অ.৩৪) বলা হয়েছে, প্রব্রজ্যার জন্য নির্দোষ এমন ব্যক্তিকে মাতাপিতার অনুমতি সাপেক্ষে প্রব্রজ্যা দেয়া উচিত। সে যদি মাথা ন্যাড়া করে আসে তো ভালো। কিন্তু মাথা ন্যাড়া করে না আসলে তখন অনেকগুলো কাজ করতে হয়। একসীমার মধ্যে অন্যান্য ভিক্ষু থাকলে তাদেরকেও তখন মাথা ন্যাড়া করার কথা জানাতে হয়। এর নিয়ম হচ্ছে এরকম।
মাথা ন্যাড়া করা
সীমার অন্তর্গত ভিক্ষুদেরকে একত্র করে প্রব্রজ্যাপ্রার্থীকে সেখানে নিয়ে গিয়ে বলতে হবে, ‘এই ছেলেটির মাথা ন্যাড়া করার ব্যাপারে মাননীয় ভান্তেসঙ্ঘের কাছে অনুমতি চাচ্ছি।’ এভাবে তিনবার বা দুইবার বা একবার বলা উচিত। অথবা ‘একে শ্রামণ করানোর ব্যাপারে অনুমতি চাচ্ছি’ অথবা ‘এর প্রব্রজ্যার ব্যাপারে অনুমতি চাচ্ছি’ অথবা ‘এ শ্রামণ হতে চায়’ অথবা ‘এ প্রব্রজ্যা নিতে চায়’ এভাবে বললেও হয়।
আবার সেই স্থানে যদি দশজন বা বিশজন বা ত্রিশজন ভিক্ষু ভাগ ভাগ হয়ে অবস্থান করে, তাহলে তাদের কাছে গিয়েও উপরোক্তভাবে মাথা ন্যাড়া করার ব্যাপারে অনুমতি প্রার্থনা করতে হয়। প্রব্রজ্যাপ্রার্থী ছাড়াই কোনো তরুণ ভিক্ষু বা শ্রামণকে পাঠিয়ে ‘ভান্তে, একজন প্রব্রজ্যাপ্রার্থী আছে, তার মাথা ন্যাড়া করার ব্যাপারে অনুমতি চাচ্ছি’ এভাবে বললেও হয়।
কোনো ভিক্ষু যদি বাসস্থানে অথবা ঝোপঝাড়ের মধ্যে প্রবেশ করে ঘুমায় অথবা ভাবনায় মগ্ন হয়, তখন তাদেরকে জানানোর জন্য গিয়েও তাদেরকে না দেখে মনে করে, ‘সবার কাছ থেকে অনুমতি চাওয়া হয়ে গেছে মনে হয়’, তাহলেও হয়। প্রব্রজ্যা হচ্ছে লঘুকর্ম। তাই প্রব্রজিত ব্যক্তি তখন সুষ্ঠুভাবেই প্রব্রজিত হয়। যে প্রব্রজ্যা দেয় তারও কোনো অপরাধ হয় না।
যদি মহাবিহার হয়, সেখানে হাজার জন ভিক্ষু থাকে, তাদেরকে এক জায়গায় একত্র করা মুশকিল হয়, একজন একজন করে গিয়ে অনুমতি চাওয়া তো আরো কষ্টকর, তখন তাকে খণ্ডসীমায় অথাব নদী বা সমুদ্রে নিয়ে গিয়ে প্রব্রজ্যা দেয়া উচিত।
যার মাথা ন্যাড়া করা আছে, অথবা ভিক্ষুত্ব ত্যাগ করেছে, অথবা নির্গ্রন্থ সন্ন্যাসীদের কোনো একজন হয়, অথবা তার চুল দুই আঙুল বা তার চেয়ে কম লম্বা হয় তাহলে সেক্ষেত্রে মাথা ন্যাড়া করার দরকার নেই। কাউকে বলারও দরকার নেই। সেভাবেই তাকে প্রব্রজ্যা দেয়া যায়। দুই আঙুলের বেশি লম্বা চুল হলে কিন্তু মাথা ন্যাড়া করার ব্যাপারে অবশ্যই অনুমতি চাইতে হবে।
পারলে উপাধ্যায়ের স্বয়ং প্রব্রজ্যা দেয়া উচিত। সারত্থদীপনী টীকা বলছে, প্রব্রজ্যা মানে বুঝায় মাথা ন্যাড়া করা, চীবর পরানো, ত্রিশরণ দেয়া। এগুলো করলেই প্রব্রজ্যা দেয়া হয়। যদি সম্ভব হয় উপাধ্যায়ের স্বয়ং এগুলো করা উচিত।
সেটা সম্ভব না হলে তার মাথা ন্যাড়া করা ও চীবর পরানোর কাজটা অন্য কোনো তরুণ ভিক্ষুকেই করতে বলা উচিত। তবে এভাবে আদেশ না দিলেও সেই তরুণ ভিক্ষুটি যদি উপাধ্যায়ের উদ্দেশ্যে প্রব্রজ্যাপ্রার্থীর মাথা ন্যাড়া করে দেয় ও চীবর পরিয়ে দেয় তাতেও কোনো সমস্যা নেই।
যদি সেখানে তরুণ ভিক্ষু না থাকে তাহলে শ্রমণকেও বলা যায়, ‘একে ঘ্যাংঘরে নিয়ে গিয়ে মাথা ন্যাড়া করে দাও। এরপর চীবর পরিয়ে আনো।’
মাথা ন্যাড়া করা ও চীবর পরানোর কাজটা শেষ হলে ত্রিশরণ দেয়ার কাজটা কিন্তু উপাধ্যায় বা আচার্যের স্বয়ং দিতে হবে।
এভাবে পুরুষ হলে ভিক্ষুর কাছে প্রব্রজিত হতে হয়। মেয়ে হলে ভিক্ষুণীর কাছে প্রব্রজিত হতে হয়। মাথা ন্যাড়া করে দেয়ার কাজটা ভিক্ষু, ভিক্ষুণী, শ্রামণ বা শ্রামণী যে কেউ করে দিতে পারে। কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু শ্রামণ বা শ্রামণীরা আদেশ পেলে তবেই চীবর পরাতে পারে।
প্রব্রজ্যাপ্রার্থী যদি নামীদামী বংশের সন্তান হয়, তাহলে ব্যস্ততার মাঝেও সময় করে স্বয়ং প্রব্রজ্যা দেয়া উচিত। ‘যাও, গোসল করে চুল ভিজিয়ে এসো’ এভাবে বলে তাকে পাঠিয়ে দেয়া উচিত নয়। প্রব্রজ্যাপ্রার্থীদের প্রথম প্রথম খুব উৎসাহ থাকে। পরে কিন্তু চীবর ও চুল কামানোর ক্ষুর দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ভয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যায়। তাই তাকে স্বয়ং স্নানঘাটে নিয়ে যাওয়া উচিত।
প্রব্রজ্যাপ্রার্থী বেশি ছোট না হলে গোসল করতে বলা উচিত। এরপর তার চুলগুলো স্বয়ং সাবান দিয়ে ধুয়ে দেয়া উচিত। কিন্তু বেশি ছোট হলে স্বয়ং পানিতে নেমে তাকে সাবান দিয়ে ডলে ডলে গোসল করানো উচিত। যদি খোসপাঁচড়া বা ফোঁড়া থাকে, তাহলে মা যেমন সন্তানকে ঘৃণা করে না সেভাবে ঘৃণা না করে ভালোভাবে তার হাত-পা-মাথা ডলে ডলে গোসল করানো উচিত। কেন? এমন উপকারের দ্বারা এই ভদ্রসন্তানদের তখন আচার্য-উপাধ্যায় ও বুদ্ধশাসনের প্রতি প্রবল স্নেহ জাগে, খুব সম্মান করে, তারা আর ফিরে যায় না। বরং কোনো মনোবেদনা জাগলেও এতে সেগুলো দূর হয়ে মনটা স্থির হয়ে যায়, কৃতজ্ঞ ও উপকারী হয়।
তবে এভাবে স্নান করানোর সময়ে অথবা চুলদাড়ি কামানোর সময়ে ‘তুমি তো খানদানি বংশের ছেলে! তুমি এসেছ যখন, এবার আমাদের আর খাওয়া ও জিনিসপত্র নিয়ে কষ্ট হবে না’ এভাবে বলা উচিত নয়। অন্যান্য অনর্থক কথাও বলা উচিত নয়। বরং ‘বন্ধু, ভালো করে মনোযোগ দাও, যাতে মনে রাখতে পার’ এভাবে বলে তাকে ত্বকপঞ্চক ভাবনা বলে দেয়া উচিত।
চুল, লোম, নখ, দাঁত, চামড়া এগুলো নিয়ে ভাবনাকে বলা হয় ত্বকপঞ্চক ভাবনা। সেটা বলে দেয়ার সময় সেগুলোর অশুচি ও ঘৃণ্য ভাব ব্যাখ্যা করেই বলে দেয়া উচিত (এর ব্যাখ্যার জন্য দেখুন বিশুদ্ধিমার্গ.১৮৩-১৮৭)। অথবা সেগুলোর নির্জীব বা নিঃসত্ত্ব ভাব ব্যাখ্যা করেও বলে দেয়া যায় (এর ব্যাখ্যার জন্য দেখুন বিশুদ্ধিমার্গ.৩১১-৩১৫)। যদি তার অতীত সংস্কার থাকে, অতীতে ভাবনা ভাবিত হয়ে থাকে, যেন কোনো পাকা ফোঁড়া যা শুধুমাত্র কাঁটা দিয়ে গুঁতানোর অপেক্ষা, অথবা যেন কোনো পদ্মকুঁড়ি যা শুধুমাত্র সূর্যোদয়ের অপেক্ষা, এমন হলে তখন সেই ভাবনায় মনোযোগ দেয়া মাত্রই বজ্রপাতের মতো তার জ্ঞান এসে ক্লেশের পর্বতকে চুরমার করে দেয়। সে মাথায় ক্ষুর লাগানো মাত্রই অর্হত্ব লাভ করে থাকে। যারা যারা এভাবে অর্হত্ব লাভ করেছে তারা সবাই এভাবে শুনে শুনে আচার্যের কথামতোই তাদের জ্ঞানকে পরিচালিত করেছিল। তাই প্রব্রজ্যার শুরুতেই এমন কথা বলা উচিত।
চুল কামানো শেষ হলে হলুদের গুঁড়ো অথবা সুগন্ধি গুঁড়ো দিয়ে মাথা ও শরীর ডলে ডলে গৃহীবস্ত্র অপসারণ করে তিনটা বা দুটো বা একটা চীবর দিতে হবে। তবে সেটা যদি তার হাতে তুলে না দিয়ে বরং আচার্য বা উপাধ্যায় নিজ হাতে পরিয়ে দেন তাহলেও ঠিক আছে। আচার্য যদি অন্য কোনো তরুণ ভিক্ষু বা শ্রামণ বা উপাসককে আদেশ দেন, ‘বন্ধু, এই চীবর নিয়ে একে পরিয়ে দাও’ তাতেও চলবে। অথবা যদি তাকেই সরাসরি বলেন, ‘এই চীবরগুলো পরে নাও’ তাহলেও চলবে। এগুলো সবই তখন ভিক্ষু কর্তৃক প্রদত্ত বলে গণ্য হয়।
কিন্তু যদি প্রব্রজ্যাপ্রার্থী কোনো আদেশ ব্যতিরেকে নিজেই অন্তর্বাস বা চীবর পরে নেয় সেটা ঠিক নয়। তখন সেটা খুলে নিয়ে আবার নতুন করে তাকে চীবর পরিয়ে দিতে হবে। ভিক্ষু যদি নিজ হাতে অথবা আদেশের মাধ্যমে চীবর দেয়, তাহলেই সেটা ঠিক হয়।
ত্রিশরণ প্রদান
এরপর তাকে চীবর একাংস করিয়ে উপস্থিত ভিক্ষুদের পায়ে ধরে বন্দনা করাতে হবে। এরপর ত্রিশরণ গ্রহণের জন্য তাকে উৎকুটিকভাবে বা উবু হয়ে দুহাত জোড় করিয়ে বসাতে হবে। এরপর তার উপাধ্যায় অথবা আচার্য কর্তৃক বলতে হবে, ‘আমি যা বলি তা বল।’ এরপর তার উপাধ্যায় বা আচার্য ‘বুদ্ধং সরণং গচ্ছামি’ ইত্যাদি যথাক্রমে বলে ত্রিশরণ দেবেন (ত্রিশরণের যথাযথ ক্রমের জন্য বিনয়পিটকের মহাবর্গের মহাখন্ধকের পব্বজ্জূপসম্পদাকথা দেখুন (মহাবর্গ.৩৪)। অথবা খুদ্দকপাঠ এর সরণত্তযং দেখুন)।
উপাধ্যায় বা আচার্য উল্টোপাল্টা বলে ত্রিশরণ দিলে সেটা হবে না। তিনি যদি ত্রিশরণের একটা শব্দ বা একটা অক্ষরও উল্টোপাল্টা বলে দেন, অথবা বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি, দুতিযম্পি বুদ্ধং সরণ গচ্ছামি, ততিযম্পি বুদ্ধং সরণং গচ্ছামি এভাবে বলেন, এরপরে ধম্মং সরণং গচ্ছামি, দুতিযম্পি ধম্মং সরণ গচ্ছামি, ততিযম্মি ধম্মং সরণং গচ্ছামি এরকম বলেন তাহলে ত্রিশরণ দেয়া হয় না। যথাক্রমেই ত্রিশরণ দিতে হয়।
শ্রামণের প্রব্রজ্যার ক্ষেত্রে উভয়কেই শুদ্ধভাবে বলতে হয়। উদাহরণস্বরূপ বুদ্ধ বলতে গিয়ে বুদ্ এবং ধ এই ব্যঞ্জনবর্ণগুলোর উচ্চারণের যাতে নড়চড় না হয় সেভাবেই আচার্যেরও বলতে হয়, শিষ্যেরও বলতে হয়। দুজনের কোনো একজন বলতে না জানলেই সেটা আর শুদ্ধ হয় না। উভয়ে বলতে জানলে তবেই ত্রিশরণ শুদ্ধ হয়।
অনুস্বার সহকারে ত্রিশরণ দেয়ার সময়ে ‘বুদ্ধং সরণং গচ্ছামি’ এভাবে একবারে একটা একটা লাইন বলে দেয়া উচিত। মকারন্ত ত্রিশরণ দেয়ার সময়ে ‘বুদ্ধম্’ ‘সরণম্’ ‘গচ্ছামি’ এভাবে আলাদাভাবে বলে দেয়া উচিত। এভাবে ত্রিশরণ গ্রহণের দ্বারা সে শ্রামণের হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
দশশীল প্রদান
তাহলে দশশীল কখন দিতে হয়? যদি শ্রামণটা বুদ্ধিমান হয়, পণ্ডিত হয়, তাহলে সেখানেই তাকে শ্রামণের শিক্ষাপদগুলো বলে দেয়া উচিত। কীভাবে? সেই দশশীলগুলো মহাবর্গের ১০৬ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে। এটা বুঝা উচিত যে, ত্রিশরণেই প্রব্রজ্যা সিদ্ধ হয়। অন্যদিকে দশ শিক্ষাপদ হচ্ছে কেবল শিক্ষা পরিপূরণের জন্য। এজন্য সেগুলো পালিতে বুঝতে না পারলেও যেকোনো ভাষায় অর্থের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বলে দেয়া যায়।
প্রব্রজ্যা দেয়ার পরে গুরু ও শিষ্যের করণীয়
শিষ্য যতদিন পর্যন্ত নিজের শিক্ষণীয় উক্ত দশটি শিক্ষাপদ না জানে, দোয়াজিক ও চীবর কীভাবে পরতে হয়, ভিক্ষাপাত্র কীভাবে ধরতে হয়, দাঁড়ানো ও বসা ইত্যাদি এবং খাওয়া দাওয়ার নিয়মগুলোতে দক্ষ না হয়, ততদিন পর্যন্ত তাকে ভোজনশালা অথবা অন্য কোনো জায়গায় পাঠানো উচিত নয়। তাকে নিজের কাছাকাছিই রাখা উচিত। ছোটো বাচ্চার মতো তাকে সবসময় দেখাশোনা করা উচিত। কপ্পিয় অকপ্পিয় বিষয়গুলো সবই শিক্ষা দেয়া উচিত। কীভাবে অন্তর্বাস পরতে হয়, কীভাবে চীবর পারুপণ করতে হয়, কীভাবে করণীয় খন্ধক ব্রতগুলো সম্পাদন করতে হয় সবই শিখিয়ে বিনীত করে তোলা কর্তব্য।
সেই শ্রামণেরও তখন দশটি নাশের কারণকে দূর থেকে বর্জন করে খন্ধক ব্রতগুলো পরিপূরণ করে করে দশশীলকে ভালোমতো শিক্ষা করা উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *