আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদার জন্য নিষিদ্ধ ব্যক্তিরা

আগের পোস্টে লিখেছিলাম কাদেরকে প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা দেয়া উচিত নয়। তবে প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা দিলে তারা অবশ্য ভিক্ষু বলে গণ্য হয়। কিন্তু নিম্নোক্ত ১১ ধরনের ব্যক্তি আছে যাদের জন্য প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা একদম নিষিদ্ধ। তাদেরকে উপসম্পদা দিলেও তারা ভিক্ষু বলে গণ্য হয় না। এদেরকে জানলে সাথে সাথে তাদের চীবর ফেলে দিতে হয়।
—১. বিকৃত যৌনরুচির ব্যক্তি—
বর্তমানে সমকামী ব্যক্তিদের অধিকার নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে তোলপাড় চলছে। পুরুষে পুরুষে সম্পর্ক হচ্ছে, নারীতে নারীতে সম্পর্ক হচ্ছে। সেগুলো এমনকি বিয়ে পর্যন্ত গড়াচ্ছে। এসব বিষয়ে ত্রিপিটকে সাধারণত তেমন তথ্য খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে প্রব্রজ্যার উপযুক্ত ব্যক্তির ব্যাপারে আলোচনা করতে গিয়ে বিনয় পিটক, তার অর্থকথা ও টীকাগুলোতে কিছু বিকৃত যৌনরুচিসম্পন্ন ব্যক্তির ব্যাপারে আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে এধরনের ব্যক্তিদেরকে “পণ্ডক” নামে অভিহিত করা হয়েছে।
পণ্ডক বলতে বুঝায় বিকৃত যৌনরুচিসম্পন্ন ব্যক্তি। এরা বিকৃত পদ্ধতিতে তাদের যৌনলালসা চরিতার্থ করে। ইংরেজিতে এদেরকে বলা হয় পার্ভার্ট (Pervert)। বিনয় পিটকের মহাবর্গ অর্থকথামতে, এধরনের ব্যক্তি হয় পাঁচ প্রকার।
১) ছিটানো ব্যক্তি : অন্যের পুরুষাঙ্গ মুখে নিয়ে বীর্য ছিটকে পড়লে যাদের কামবাসনার উপশম হয় তারা হচ্ছে ছিটানোর যৌনরুচিসম্পন্ন ব্যক্তি (আসিত্তপণ্ডক)।
২) ঈর্ষাকাতর ব্যক্তি: অন্যদের যৌন কর্মকাণ্ড দেখে যাদের ঈর্ষাজনিত কামবাসনার উপশম হয় তারা হচ্ছে ঈর্ষাকাতর যৌনরুচির ব্যক্তি (উসূযপণ্ডক)।
৩) পাক্ষিক ব্যক্তি: অকুশল কর্মের ফল হিসেবে যাদের মাসের কৃষ্ণপক্ষে (অর্থাৎ পূর্ণিমার পর থেকে অমাবস্যা পর্যন্ত দিনগুলোতে) বিকৃত যৌনরুচি জাগে, কিন্তু শুক্লপক্ষে (অর্থাৎ অমাবস্যার পর থেকে শুরু করে পূর্ণিমা পর্যন্ত দিনগুলোতে) সেরকম মনমানসিকতা থাকে না, তারা হচ্ছে পাক্ষিক যৌনরুচির ব্যক্তি (পক্খপণ্ডক)।
৪) খোজা ব্যক্তি: যাদের অণ্ডকোষগুলো কোনো না কোনোভাবে অপসারিত হয়েছে তারা হচ্ছে খোজা ব্যক্তি (ওপক্কমিকপণ্ডক)।
৫) নপুংসক ব্যক্তি: যারা জন্ম থেকেই লিঙ্গহীন, তাদেরকে বলা হয় নপুংসক ব্যক্তি (নপুংসকপণ্ডক)।
বর্তমানে যারা সমকামী তাদেরকে এমন বিকৃত যৌনরুচিসম্পন্ন ব্যক্তির শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা যায়।
এদের মধ্যে ছিটানো ব্যক্তি ও ঈর্ষাকাতর ব্যক্তিকে প্রব্রজ্যা দিতে বাধা নেই। কিন্তু বাকি তিন প্রকার বিকৃত যৌনরুচিসম্পন্ন ব্যক্তির ক্ষেত্রে কিন্তু প্রব্রজ্যা দিতেও নিষেধ করা হয়েছে। তাদেরকে ভিক্ষু করা উচিত নয়। যদি না জেনে ভিক্ষু করা হয় তাহলেও তারা ভিক্ষু হয় না। তাদেরকে চীবর ত্যাগে বাধ্য করতে হয়।
ছিটানো, ঈর্ষাকাতর ও পাক্ষিক, এই তিন প্রকার বিকৃত যৌনরুচিসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্ম থেকেই এমন বিকৃত যৌনস্বভাব থাকে। তারা জন্মগতভাবে অহেতুক ব্যক্তি। তাই তাদের ইহজীবনে মার্গফল লাভ করা অসম্ভব। (মহাবর্গ অর্থকথা.১০৯; সারত্থদীপনী টীকা-৩.১০৯)
তবে এই পাঁচ প্রকার ব্যক্তি যদি কুশল কর্ম করে, তাহলে পরবর্তী জীবনে স্বর্গে যেতে তাদের জন্য কোনো বাধা নেই। পারাজিকা অর্থকথায়ও (পারা.অ.২.২৩৩) বলা হয়েছে, এমন বিকৃত যৌনরুচির ব্যক্তি, তির্যক প্রাণি ও উভয়লিঙ্গধারী ব্যক্তিরা হচ্ছে অহেতুক প্রতিসন্ধি নিয়ে জন্ম। তাদের জন্য স্বর্গের দ্বার খোলা, কিন্তু ইহজন্মে তাদের মার্গফল অসম্ভব।
—২. ছদ্মবেশী চোর—
থেয্যসংৰাসক বা ছদ্মবেশী চোর হচ্ছে ছদ্মবেশ ধরে ভিক্ষুদের সাথে অবস্থানকারী। এরকম ছদ্মবেশী চোর হচ্ছে তিন ধরনের- প্রব্রজ্যাচোর (লিঙ্গত্থেনক), ভিক্ষুত্বচোর (সংৰাসত্থেনক), উভয়চোর (উভযত্থেনক)।
এদের মধ্যে যে নিজেই চুলদাড়ি কামিয়ে চীবর পরিধান করে, সে হয় প্রব্রজ্যাচোর। সে বিহারে গিয়ে ভিক্ষুবর্ষা গণনা করে না, জুনিয়র ভিক্ষুদের বন্দনাও গ্রহণ করে না, বয়োজ্যেষ্ঠদেরকে আসন ছেড়ে দেয় না, উপোসথ ও প্রবারণা ইত্যাদিতে যায় না। সে শুধুমাত্র প্রব্রজিতের ছদ্মবেশে বিহারে অবস্থান করে। তাই তাকে বলা হয় প্রব্রজ্যাচোর।
আবার কোনো শ্রামণ যদি যথানিয়মে ভিক্ষুদের কাছে প্রব্রজিত হয়, কিন্তু অন্য জায়গায় গিয়ে নিজেকে দশবর্ষা বা বিশবর্ষার ভিক্ষু বলে পরিচয় দেয়, ভিক্ষুবর্ষা গণনা করে, জুনিয়র ভিক্ষুদের বন্দনা গ্রহণ করে, সিনিয়র ভিক্ষুদেরকে আসন ছেড়ে দেয়, উপোসথ ও প্রবারণা ইত্যাদিতে যায়, সেই শ্রামণ কিন্তু ভিক্ষুর ছদ্মবেশেই ভিক্ষুদের সাথে থাকে। তাই তাকে বলা হয় ভিক্ষুত্বচোর।
আবার যে ব্যক্তি স্বয়ং চুলদাড়ি কামিয়ে, চীবর পরিধান করে বিহারে গিয়ে ভিক্ষুবর্ষা গণনা করে, জুনিয়র ভিক্ষুদের বন্দনা গ্রহণ করে, সিনিয়র ভিক্ষুদেরকে আসন ছেড়ে দেয়, উপোসথ ও প্রবারণা ইত্যাদিতে যায়, সে প্রব্রজ্যা ও ভিক্ষুত্ব উভয়ই চুরি করেছে বলে তাকে বলা হয় উভয়চোর।
এই তিন ধরনের ছদ্মবেশী চোরদেরকে উপসম্পদা দেয়া উচিত নয়। উপসম্পদা দিলেও তার চীবর ফেলে দেয়া উচিত। পুনরায় প্রব্রজ্যা প্রার্থনা করলেও প্রব্রজ্যা দেয়া উচিত নয়।
এক্ষেত্রে এই গাথাও জানা উচিত-
রাজা, দুর্ভিক্ষ, বিপদসংকুল পথ, রোগ, শত্রু, ভয় ইত্যাদি কারণে চীবর পরিধান করে যে ব্যক্তি,
যতক্ষণ পর্যন্ত সে ভিক্ষুত্বের ব্যাপারগুলোকে অনুমোদন না করে শুদ্ধ মন নিয়ে থাকে,
ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে ছদ্মবেশী চোর বলা হয় না।
এর ব্যাখ্যা হচ্ছে এরকম। এখানে কারো কারো প্রতি রাজা খুব ক্রুদ্ধ হন। তখন সেই ব্যক্তি স্বয়ং চীবর পরিধান করে পালিয়ে যায়। তা দেখে লোকজন রাজাকে সেই সংবাদ জানায়। রাজা বলেন, ‘প্রব্রজিত হলে আর কী করা।’ তা জেনে সেই ব্যক্তি যদি সঙ্ঘের মাঝে না গিয়ে তার আগেই গৃহী বেশ ধরে বিহারে আসে, তাহলে তাকে প্রব্রজ্যা দেয়া উচিত।
তবে যদি ‘বুদ্ধশাসনের মাধ্যমেই বেঁচে গেলাম, বরং প্রব্রজ্যা নিয়ে নিই’ এই ভেবে গৃহীবেশে না এসে সেই ভিক্ষুবেশেই বিহারে আসে, কিন্তু ভিক্ষুদের করণীয় আগন্তুকব্রত ইত্যাদি সে গ্রহণ না করে, ভিক্ষুদের প্রশ্নের উত্তরে সবকিছু খুলে বলে প্রব্রজ্যা প্রার্থনা করে, তাহলে তার চীবর খুলে নিয়ে প্রব্রজ্যা দিতে হবে। কিন্তু যদি আগন্তুক ব্রত গ্রহণ করে, ভিক্ষুর মতো আচরণ করে, উপরে উল্লেখিত বর্ষা গণনা ইত্যাদি করে, তাহলে তাকে আর প্রব্রজ্যা দেয়া উচিত নয়।
এভাবে দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে বেঁচে থাকতে কষ্টকর হয়েও কেউ কেউ স্বয়ং চীবর পরিধান করে। বিপদসংকুল পথ দেখে কেউ কেউ স্বয়ং চীবর পরিধান করে। রোগভয়ে, শত্রুর ভয়েও কেউ কেউ স্বয়ং চীবর পরিধান করে। তাদের ক্ষেত্রেও রাজভয়ে চীবর পরিহিত ব্যক্তির আলোচনায় উল্লেখিত বিধি মোতাবেক বিচার করতে হবে।
এক ভিক্ষু জ্ঞাতিকুলে গিয়ে ভিক্ষুত্ব ত্যাগ করে গৃহী হয়ে ভাবে, ‘এই চীবরগুলো এখানে থাকলে নষ্ট হয়ে যাবে। যদি এগুলো নিয়ে আবার বিহারে ফেরত দিতে যাই তাহলে ডাকাতের দল আমাকে ধরবে। তার চেয়ে বরং চীবরগুলো পরিধান করে যাই।’ সে অন্তর্বাস ও চীবর পরে ভিক্ষুর বেশে বিহারে যায়। তাকে দূর থেকে আসতে দেখে শ্রামণ ও তরুণ ভিক্ষুরা স্বাগত জানাতে এগিয়ে যায়, আগন্তুক ব্রতের করণীয় কাজগুলো করতে থাকে। কিন্তু সে সেগুলোতে সম্মতি দেয় না। বরং তার ব্যাপারটা খুলে বলে। যদি ভিক্ষুরা তাকে গৃহী হতে না দিয়ে জোর করে প্রব্রজ্যা দিতে চায়, তখন তার চীবরগুলো খুলে নিয়ে আবার প্রব্রজ্যা দিতে হবে। কিন্তু যদি সে ভাবে, ‘এরা আমার ভিক্ষুত্ব ত্যাগের ব্যাপারটা জানে না।’ এই ভেবে বর্ষা গণনা ইত্যাদির মাধ্যমে নিজেকে ভিক্ষু হিসেবে দেখায় তাহলে তাকে প্রব্রজ্যা দেয়া উচিত নয়।
অন্য কোনো বয়স্ক শ্রামণ যদি জ্ঞাতিকুলে গিয়ে চীবর ত্যাগ করে। কিন্তু ঘরের কাজকর্ম করতে করতে ত্যক্তবিরক্ত হয়ে ভাবে, ‘এখন যদি শ্রামণ হই তাহলে ভান্তে আমার শ্রামণ হওয়ার বিষয়টা জানতে পারবে না।’ এই ভেবে পাত্রচীবর নিয়ে বিহারে যায়, তার চীবর ত্যাগের ব্যাপারটা কাউকে না জানায়, শ্রামণ হিসেবেই নিজেকে দেখায়, সে তখন প্রব্রজ্যা চোর হয়। সে আর প্রব্রজ্যা লাভ করতে পারে না। তবে চীবর পরার সময়ে যদি মনে মনে বলে, ‘কাউকে বলবো না।’ কিন্তু বিহারে গিয়ে ঠিকই বিষয়টা জানায় তাহলে ঐ চীবর পরার সময়েই সে প্রব্রজ্যাচোর হয়। আবার যদি চীবর পরার সময়ে বলার ইচ্ছা জাগে, কিন্তু বিহারে গিয়ে সেটা গোপন রাখে, তাহলেও প্রব্রজ্যাচোর হয়। যদি চীবর পরার সময়ে গোপন করার মন না থাকে এবং বিহারে গিয়েও গোপন না করে, তাহলে তাকে পুনরায় প্রব্রজ্যা দেয়া যায়।
অন্য এক ছোট শ্রামণ আগের মতোই জ্ঞাতিকুলে গিয়ে চীবর ত্যাগ করে। কিন্তু গরু চরানো ইত্যাদি কাজ আর করতে চায় না। জ্ঞাতিরা তখন তাকে চীবর পরিয়ে দিয়ে পাত্র হাতে দিয়ে ‘যাও, শ্রামণ হয়েই থাক’ বলে ঘর থেকে বের করে দেয়। সে বিহারে চলে যায়। তার চীবর ত্যাগ করে আবার চীবর পরার কথা কোনো ভিক্ষুই জানে না। শ্রামণটা নিজেও কিন্তু জানে না এভাবে আবার চীবর পরলে প্রব্রজ্যা চোর হয়। সে যদি বয়স পরিপূর্ণ হয়ে ভিক্ষু হয়, তাহলে তার ভিক্ষুত্ব ঠিকই থাকে। সে যথাযথ ভিক্ষুই হয়ে যায়। কিন্তু যদি ভিক্ষু হওয়ার আগে বিনয় নিয়ে আলোচনাকালে শোনে, ‘যে এভাবে প্রব্রজ্যা নেয়, সে প্রব্রজ্যা চোর হয়’ তখন যদি সে তার ব্যাপারটা ভিক্ষুদেরকে জানায়, তাহলে আবার প্রব্রজ্যা লাভ করতে পারে। কিন্তু যদি ভাবে, ‘আমার ব্যাপারটা কেউই না জানুক’ এভাবে মনে করলে সে সেখানেই প্রব্রজ্যাচোর হয়ে যায়।
ভিক্ষু তার ভিক্ষুত্ব ত্যাগ করলেও চীবরাদি খুলে না ফেলে দুঃশীল কর্ম করে বা না করে আগের মতো ভিক্ষুদের বর্ষা গণনা ইত্যাদি করলে তখন প্রব্রজ্যাচোর হয়। তবে যদি ভিক্ষুত্ব ত্যাগ না করেই, ভিক্ষু বেশেই যৌনসংসর্গে লিপ্ত হয়ে স্বাভাবিক নিয়মে বর্ষাগণনা ইত্যাদি করে, তখন কিন্তু সে প্রব্রজ্যাচোর হয় না। তাকে কেবল প্রব্রজ্যা দেয়া যায়।
কোনো ভিক্ষু যদি স্বেচ্ছায় গৃহী বস্ত্র পরিধান করে যৌন সংসর্গে লিপ্ত হয়। এরপর আবার চীবর পরে ভিক্ষুদের মতোই স্বাভাবিক নিয়মে বর্ষাগণনা ইত্যাদি করে। সেও প্রব্রজ্যাচোর হয় না। তাকে কেবল প্রব্রজ্যা দেয়া যায়। কিন্তু যদি চীবর পরিধান করেই ভিক্ষুত্ব ত্যাগ করে গৃহী বস্ত্র পরিধান করে যৌনসংসর্গে লিপ্ত হয়, এরপর আবার চীবর পরিধান করে স্বাভাবিক ভিক্ষুর মতো বর্ষাগণনা ইত্যাদি করে, সে হয় প্রব্রজ্যাচোর।
কোনো শ্রামণ যদি শ্রামণের বেশেই যৌন সংসর্গ ইত্যাদি পাপকর্ম করে, তাতে কিন্তু সে প্রব্রজ্যাচোর হয় না। যদি স্বেচ্ছায় চীবর খুলে ফেলে যৌনসংসর্গে লিপ্ত হয়ে আবার চীবর পরিধান করে তাতেও প্রব্রজ্যাচোর হয় না। কিন্তু যদি চীবর পরিহিত অবস্থাতেই শ্রামণত্ব ত্যাগ করে চীবর খুলে ফেলে, গৃহী পোশাক পরে যৌনসংসর্গে লিপ্ত হয়ে আবার চীবর পরিধান করে, তখন সে প্রব্রজ্যাচোর হয়। যদি গৃহী হওয়ার ইচ্ছায় চীবর গৃহীদের মতো গিঁট দিয়ে অথবা অন্য কোনো গৃহী স্টাইলে পরিধান করে জিজ্ঞেস করে, ‘এই গৃহীবেশে আমাকে মানাচ্ছে নাকি মানাচ্ছে না?’ তাতেও সে শ্রামণই থাকে। কিন্তু মানাচ্ছে বলার পরে যদি সে তাতে সায় দিয়ে আবার চীবরাদি পরিধান করে, তাহলে প্রব্রজ্যাচোর হয়। গৃহী বস্ত্র পরিধান করে সেরকম প্রশ্ন করলে সেক্ষেত্রেও একই নিয়ম।
তবে যদি চীবরের উপরে গৃহী বস্ত্র চাপিয়ে দিয়ে সেরকম জিজ্ঞেস করে বা তাতে সায় দেয়, তাতে কিন্তু শ্রামণত্ব থাকে।
কোনো বুড়োবয়সে প্রব্রজিত শ্রামণ যদি সারিতে দাঁড়ানো ভিক্ষুদের গ্রাহ্য না করে একপাশে গিয়ে বিরাট সসপ্যান থেকে চামচে করে ভাত নিয়ে পাত্র নিয়ে বাজপাখির মতো মাংসের টুকরো নিয়ে চলে যায় সে কিন্তু ভিক্ষুত্বচোর হয় না। কিন্তু ভিক্ষুর মতো বর্ষাগণনা ইত্যাদি করলে তখন সে ভিক্ষুত্বচোর হয়।
কোনো শ্রামণ যদি শ্রামণত্বের বয়স হিসেব করতে গিয়ে বর্ষাগণনায় মিথ্যা বলে কোনোকিছু গ্রহণ করে, তাতে সে প্রব্রজ্যাচোর হয় না। কিন্তু মিথ্যা বলার কারণে সে লিঙ্গনাশের যোগ্য হয়।
কোনো ভিক্ষু যদি বর্ষা গণনায় মিথ্যা বলে কোনো দ্রব্য গ্রহণ করে, তাহলে গৃহীত দ্রব্যের মূল্য অনুসারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। তবে তাই বলে সে কিন্তু প্রব্রজ্যাচোর হয় না। (মহাবর্গ অর্থকথা.১১০)
—৩. তির্থীয় পক্ষাবলম্বী—
কোনো ভিক্ষু তির্থীয় সম্প্রদায়ে চলে গেলে তাদেরকে আর উপসম্পদা দেয়া উচিত নয়। প্রব্রজ্যা দেয়াও উচিত নয়।
কোনো ভিক্ষু যদি তির্থীয় হওয়ার উদ্দেশ্যে ভিক্ষুর বেশেই তির্থীয়দের আশ্রমে যায় তার প্রতি পদক্ষেপে দুক্কট হয়। তির্থীয়দের বেশভূষা গ্রহণে সে তির্থীয় হয়ে যায়। আবার যে ভিক্ষু তির্থীয় হবে বলে নিজেই গাছের বাকল ইত্যাদি পরিধান করে, সেও তির্থীয় হয়ে যায়। আবার কোনো ভিক্ষু যদি নগ্ন হয়ে গোসল করার সময়ে নিজেকে দেখে ভাবে, ‘উলঙ্গ সন্ন্যাসী হলে আমাকে মানায়। তাই উলঙ্গ সন্ন্যাসী হবো’ এই ভেবে চীবর না পরেই উলঙ্গ সন্ন্যাসীদের আশ্রমের দিকে রওনা দিলে পদে পদে দুক্কট হয়। মাঝপথে যদি লজ্জা চলে আসে, তাহলে আপত্তিদেশনা করে সেগুলো থেকে মুক্ত হয়ে যায়। উলঙ্গ সন্ন্যাসীদের আশ্রমে গিয়ে তাদের ভাবসাব দেখে অথবা তাদের উপদেশ শুনে ‘এদের প্রব্রজ্যা বড়ই কষ্টের’ এই ভেবে ফিরে চলে আসলে কোনো সমস্যা নেই।
কিন্তু সে যদি জিজ্ঞেস করে, ‘তোমাদের প্রব্রজ্যায় কোন জিনিসটি উৎকৃষ্ট?’ তখন তির্থীয়রা যদি চুলদাড়ি উপড়ে ফেলা ইত্যাদি বলে দেয়। তা শুনে সে যদি একটি চুলও উপড়ে ফেলে, উৎকুটিক ব্রত ইত্যাদির একটি ব্রতও গ্রহণ করে, ময়ুরের লেজ ইত্যাদি পরিধান করে, তাদের বেশভূষা গ্রহণ করে, ‘এই প্রব্রজ্যাই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ’ এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, তা আর ত্যাগ করে না, তখন সে তির্থীয় হয়ে যায়। কিন্তু যদি ‘তির্থীয় প্রব্রজ্যায় আমাকে মানায় কি মানায় না?’ এভাবে দেখার জন্য গাছের বাকল ইত্যাদি পরিধান করে, চুলের জটা বাঁধে, তির্থীয়দের ঝুড়ি গ্রহণ করে, সেক্ষেত্রে যতক্ষণ পর্যন্ত সে তাতে মানাচ্ছে বলে সায় না দেয়, ততক্ষণ পর্যন্ত ভিক্ষুত্ব থাকে। কিন্তু তির্থীয়বেশে মানাচ্ছে বলে সায় দেয়া মাত্রই সে তির্থীয় হয়ে যায়। তবে ভিক্ষু যদি চীবর হারিয়ে গাছের বাকল ইত্যাদি পরিধান করে অথবা রাজভয় ইত্যাদির কারণে তির্থীয়দের বেশ ধরে, তখনো কিন্তু সে ভিক্ষুই থাকে, তির্থীয় হয়ে যায় না। কারণ সে কিন্তু তাদের মতবাদ গ্রহণ করে নি, তাদের মতবাদকে সমর্থন করে নি।
এই তির্থীয় হয়ে যাওয়াটা কিন্তু ভিক্ষুর ক্ষেত্রেই বলা হয়েছে। তাই ভিক্ষু যদি তির্থীয় হয়ে আবার প্রব্রজ্যা চাইতে আসে তাহলে তাকে পুনরায় প্রব্রজ্যা দেয়া উচিত নয়, উপসম্পদা দেয়াও উচিত নয়। কিন্তু শ্রামণ যদি চীবর পরেই তির্থীয় আশ্রমে যায়, ফিরে আসলে আবার তাকে প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা দেয়া যায় বলে কুরুন্দি অর্থকথায় বলা হয়েছে। (মহাবর্গ অর্থকথা.১১০)
—৪. তির্যক প্রাণি—
তির্যক প্রাণিকে প্রব্রজ্যা দেয়া যাবে না, উপসম্পদা দেয়া যাবে না। ভিক্ষু হলেও তাকে চীবর ত্যাগ করাতে হবে। এখানে নাগ, সুপর্ণ অথবা দেবরাজ ইন্দ্র থেকে শুরু করে যেকোনো অমনুষ্য জাতি, সবই এখানে তির্যক প্রাণির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। (মহাবর্গ.১১১)
—৫. মাতৃঘাতক—
মাতৃঘাতককে প্রব্রজ্যা দেয়া যাবে না, উপসম্পদা দেয়া যাবে না। ভিক্ষু হলেও তাকে চীবর ত্যাগ করাতে হবে।
এক্ষেত্রে মাতা যদি মনুষ্য স্ত্রীলোক হয় এবং সেই মাতাকে যদি সে সজ্ঞানে হত্যা করে, তাহলে সেই ব্যক্তির মাতৃহত্যাজনিত অানন্তরিক পাপকর্ম হয়। তার প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা নিষিদ্ধ।
কিন্তু মনুষ্য স্ত্রীলোক হলেও যদি তার জন্মদায়ী মাতা না হয়, পালক মাতা ইত্যাদি হয়, সেক্ষেত্রে তার প্রব্রজ্যা নিষিদ্ধ নয়। সেটা তার মাতৃহত্যাজনিত আনন্তরিক পাপকর্মও হয় না।
কিন্তু যদি কোনো ব্যক্তি স্বয়ং তির্যক জাতের হয়, তার মাতা হয় কোনো মনুষ্য স্ত্রীলোক, সেই মাতাকে সে হত্যা করে, তাতেও তার আনন্তরিক পাপকর্ম হয় না। তবে নিজে তির্যক জাতির হওয়ায় তার প্রব্রজ্যা নিষিদ্ধ। (মহাবর্গ.১১২)
—৬. পিতৃঘাতক—
পিতৃঘাতককে প্রব্রজ্যা দেয়া যাবে না, উপসম্পদা দেয়া যাবে না। ভিক্ষু হলেও তাকে চীবর ত্যাগ করাতে হবে।
কোনো ব্যক্তি বেশ্যার সন্তান হয়। কে তার পিতা সেটাও সে জানে না।অথচ প্রকৃতপক্ষে যে তার জন্মদাতা পিতা তাকে সে পিতা হিসেবে না জানলেও সজ্ঞানে হত্যা করেছে। সেক্ষেত্রে সেই ব্যক্তির পিতৃহত্যাজনিত অানন্তরিক পাপকর্ম হয়ে যায়। তার প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা নিষিদ্ধ। (মহাবর্গ অর্থকথা.১১৩)
লিঙ্গ পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া পিতামাতার ক্ষেত্রেও একই কথা।
স্বয়ং মনুষ্য হয়ে তির্যক জাতির পিতা বা মাতাকে হত্যা করলে, অথবা স্বয়ং তির্যক জাতির হয়ে মনুষ্য পিতা বা মাতাকে হত্যা করলে, অথবা স্বয়ং তির্যক জাতির হয়ে তির্যক জাতির পিতা বা মাতাকে হত্যা করলে আনন্তরিক কর্ম হয় না। কিন্তু খুব বলবান পাপকর্ম হয়। আনন্তরিক কর্মের কাছাকাছি হয়।
সারত্থদীপনী টীকায় বলা হয়েছে, কোনো ছাগলকে মারতে গিয়ে যদি ছাগলের স্থানে দাঁড়ানো মানুষকে হত্যা করে, সেই মানুষটি যদি তার পিতা বা মাতা হয়, অথবা অর্হৎ হয় তাহলে আনন্তরিক কর্ম হয়। (সার.দী.টী.৩.১১৫)
—৭. অর্হৎঘাতক—
অর্হৎঘাতককে প্রব্রজ্যা দেয়া যাবে না, উপসম্পদা দেয়া যাবে না। ভিক্ষু হলেও তাকে চীবর ত্যাগ করাতে হবে।
এখানে অর্হৎ বলতে মনুষ্য অর্হৎ বুঝাচ্ছে। যদি কোনো বালক বা বালিকা অপ্রব্রজিত অবস্থায় অর্হত্ব লাভ করে, এমনকি তাদেরকে সজ্ঞানে হত্যা করলেও অর্হৎঘাতক হয়ে যায়। তখন আনন্তরিক পাপকর্ম হয়ে যায়। তার প্রব্রজ্যা তখন নিষিদ্ধ।
কিন্তু অমনুষ্য অর্হৎ অথবা মানুষের মধ্যে অবশিষ্ট আর্যব্যক্তিদের হত্যা করলে আনন্তরিক কর্ম হয় না। সেক্ষেত্রে তাকে প্রব্রজ্যা দেয়া যায়। তবে তার কর্ম কিন্তু বলবতী পাপকর্ম হয়ে যায়।
তির্যক ব্যক্তি যদি কোনো মনুষ্য অর্হৎকে হত্যা করে, তাতে কিন্তু তার আনন্তরিক কর্ম হয় না। তবে বলবতী পাপকর্ম হয়।
—৮. ভিক্ষুণীদূষক—
যে ব্যক্তি স্বাভাবিক ভিক্ষুণীর মুখ, পায়ুপথ অথবা যৌনাঙ্গের কোনোটার মাধ্যমে ধর্ষণ করে, সে হয় ভিক্ষুণী দূষক। তার প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা নিষিদ্ধ। তবে যে ব্যক্তি কায়িক স্পর্শের মাধ্যমে ভিক্ষুণীর শীল বিনষ্ট করে দেয়, তার প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা নিষিদ্ধ নয়।
জোর করে গৃহী বস্ত্র পরিয়ে দিয়ে ধর্ষণ করলে সেটাও ভিক্ষুণীদূষক হয়।
তবে জোর করে গৃহী বস্ত্র পরিয়ে দেয়ার পরে যদি ভিক্ষুণী তাতে সায় দেয়, তখন কিন্তু সেই ব্যক্তি ভিক্ষুণীদূষক হয় না। কেন? কারণ গৃহীবেশে সায় দেয়া মাত্রই সে আর ভিক্ষুণী থাকে না।
ভিক্ষুণীর শীল বিনষ্ট হওয়ার পরে যদি তাকে যৌন নিপীড়ন করে অথবা শিক্ষামানা ও শ্রামণীকে যৌন নিপীড়ন করে তাতেও সে ভিক্ষুণীদূষক হয় না। তাকে প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা দেয়া যায়।
—৯. সঙ্ঘভেদকারী—
যে ভিক্ষু দেবদত্তের মতো অধর্ম ও অবিনয়কে ভিত্তি করে চার প্রকার সঙ্ঘকর্মের যেকোনো একটির মাধ্যমে সঙ্ঘকে বিভক্ত করে, সে হচ্ছে সঙ্ঘভেদকারী। তার প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা নিষিদ্ধ।
—১০. বুদ্ধের রক্তপাতকারী—
দেবদত্তের মতো বিদ্বেষচিত্তে বুদ্ধের দেহ থেকে ছোট্ট মাছির পান করার মতো রক্তপাত করালেও সে বুদ্ধের রক্তপাতকারী হয়। তার প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা নিষিদ্ধ। তবে রোগের উপশমের জন্য জীবকের মতো ছুরি দিয়ে বুদ্ধের আহত স্থান চিরে দূষিত মাংস ও রক্ত বের করে দিয়ে ভালো করালে সে বহু পুণ্য অর্জন করে।
কিন্তু বুদ্ধের পরিনির্বাণের পরে যে চৈত্যগুলো ভেঙে দেয়, বোধিবৃক্ষকে কেটে ফেলে, ধাতুগুলোতে আক্রমণ করে, তার কী হবে? সারত্থদীপনী টীকামতে, তারও অানন্তরিক কর্মের মতোই পাপকর্ম হয়ে যায়।
কোনো স্তুপে বা বুদ্ধমূর্তিতে যদি ধাতু থাকে, তাহলে তার সুবিধার্থে বোধিবৃক্ষের শাখা কেটে দেয়া যায়। যদি তাতে বসে পাখিরা চৈত্যে পায়খানা করে দেয়, তাহলে শাখা কেটে দেয়া উচিত। পরিভোগ চৈত্য থেকে শরীরচৈত্য হচ্ছে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। তাই চৈত্যে ধাতু থাকলে সেই চৈত্যকে ভেদ করে বোধিবৃক্ষের শেকড় চলে গেলে সেই শেকড়ও কেটে ফেলে দেয়া উচিত।
বোধিবৃক্ষের শাখা যদি বোধিঘরের সাথে বাধা সৃষ্টি করে, তাহলে সেই বোধিঘর রক্ষার্থে বোধিবৃক্ষের শাখা কেটে দেয়া ঠিক নয়। বোধিবৃক্ষের জন্যই বোধিঘর। বোধিঘরের জন্য বোধিবৃক্ষ নয়। আসনঘরের ক্ষেত্রেও সেই একই কথা। তবে আসনঘরে যদি ধাতু নিহিত থাকে, তাহলে তা রক্ষার জন্য বোধিবৃক্ষের শাখা কেটে দেয়া যায়।
বোধিবৃক্ষের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য বোধিবৃক্ষের শাখা কেটে দেয়া যায়, মরা পঁচা ডালপালাগুলো ছেঁটে দেয়া যায়। তাতে বুদ্ধের দেহকে গোসল করানোর মতো পুণ্য হয়। (সার.দী.টী.৩.১১৫)
—১১. উভয় লিঙ্গ ব্যক্তি—
উভয় লিঙ্গের ব্যক্তি দুধরনের হয়- নারী উভয়লিঙ্গধারী এবং পুরুষ উভয় লিঙ্গধারী।
নারী উভয়লিঙ্গধারীর দেহে নারীর বৈশিষ্ট্যগুলোই বাহ্যিকভাবে প্রকাশ পায়, পুরুষের লক্ষণগুলো লুকানো থাকে। পুরুষ উভয়লিঙ্গধারীর দেহে পুরুষের বৈশিষ্ট্যগুলো বাহ্যিকভাবে প্রকাশ পায়, নারীর লক্ষণগুলো লুকানো থাকে।
নারী উভয়লিঙ্গধারী নিজে গর্ভধারণ করে, তার পুরুষাঙ্গ দ্বারা অন্যকেও গর্ভবতী করে। পুরুষ উভয়লিঙ্গধারী নিজে গর্ভধারণ করে না, কিন্তু অন্যকে গর্ভবতী করে। এই হচ্ছে তাদের মধ্যে পার্থক্য।
এই দুধরনের উভয়লিঙ্গধারীর জন্য প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা নিষিদ্ধ।
এভাবে উপরোক্ত ১১ প্রকার ব্যক্তিকে প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা দিতে নেই। অজান্তে হলেও জানা মাত্রই তাদেরকে চীবর ত্যাগ করাতে হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *