আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

উপসম্পদার বিবিধ বিষয়

প্রব্রজ্যা ও শ্রামণদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে উপসম্পদার কিছু বিষয়ও সেই সাথে জানলাম। উপসম্পদা নিতে গেলে পরিপূর্ণ বিশ বছর হতে হয়। সেটার হিসাব করতে গিয়ে অধিমাসের বিষয়টা চলে আসে। অধিমাস যে বর্ষা ঋতুর সাথেই যোগ করতে হয় সেটাও এখান থেকেই জানলাম। অর্থাৎ অধিমাস হলে অতিরিক্ত দুটি উপোসথ বর্ষা ঋতুতেই যোগ করতে হয়, গ্রীষ্ম ঋতুতে নয়। অর্থকথা ও টীকার সমর্থন পেয়ে তাই মায়ানমারের প্রচলিত ক্যালেণ্ডারের নিয়মটার উপর আরো আস্থা এসে গেল আমার।
১. অন্যতির্থীয় ব্যক্তির উপসম্পদা
অন্যতির্থীয় ব্যক্তি যদি আগেও ভিক্ষু হয়ে আবার চলে যায়, কিন্তু পরবর্তীতে আবার প্রব্রজ্যা নিতে আসে তাহলে তাকে প্রব্রজ্যা বা উপসম্পদা দেয়া উচিত নয়। কিন্তু সে যদি আগে ভিক্ষু না হয়ে থাকে তাহলে তাকে পরিবাস দিতে হবে।
তবে এক্ষেত্রেও কিছু বিবেচ্য বিষয় আছে। পরিবাস দিতে হয় আজীবক অথবা অচেলক তির্থীয়দেরকে। আজীবক তির্থীয়রা শুধুমাত্র এক খণ্ড কাপড় দেহের উপরের অংশে বেষ্টন করে বগলের মধ্যে গুঁজে রাখে। দেহের নিচের অংশ থাকে নগ্ন। অন্যদিকে অচেলক তির্থীরা সবটুকু নগ্ন হয়ে থাকে। এই দুধরনের তির্থীয় যদি সে২. ভাবে নগ্ন হয়ে আসে তাহলে তাদেরকে পরিবাস দিতে হবে। কিন্তু যদি দেহের নিচের অংশে কোনো কাপড় অথবা পশুর লোমের কম্বল ইত্যাদি পরিধান করে আসে, তাহলে তাদেরকে পরিবাস দিতে হয় না। যদি তির্থীয় বেশেই ধর্মকথা শুনে সে স্রোতাপন্ন হয়ে যায় তাহলে পরিবাস দেয়ার দরকার নেই। তখনি তাকে প্রব্রজ্যা দিয়ে উপসম্পদা দেয়া উচিত।
অন্যান্য তাপসদের ক্ষেত্রে পরিবাস দিতে হয় না।
যারা অগ্নির উপাসনাকারী তাপস তাদেরকেও পরিবাস ছাড়াই সরাসরি প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা দেয়া যায়।
কোনো শাক্যজাতির লোক যদি অন্যতির্থীয় হয়ে আবার ভিক্ষু হতে আসে তাকেও সরাসরি প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা দেয়া যায়। এটা হচ্ছে জ্ঞাতি হিসেবে বুদ্ধ কর্তৃক প্রদত্ত সুবিধা।
২. বিশ বছর বয়স্ক ব্যক্তির উপসম্পদা
বিশ বছরের কমবয়স্ক ব্যক্তিকে প্রব্রজ্যা দেয়া যায়, কিন্তু উপসম্পদা দেয়া যায় না। উপসম্পদা দিলেও সে ভিক্ষু হিসেবে গণ্য হয় না। যতক্ষণ পর্যন্ত সে তা না জানে ততক্ষণ পর্যন্ত তার স্বর্গ বা মার্গফলের অন্তরায় হয় না। জানলে কিন্তু যথা নিয়মে পুনরায় উপসম্পদা নিতে হয়।
ভিক্ষুর উপসম্পদার জন্য বয়স গণনা করতে গিয়ে প্রতিসন্ধি গ্রহণ হতে শুরু করে বয়স গণনা করা হয়। গর্ভে প্রতিসন্ধি গ্রহণ থেকে শুরু করে বিশ বছর পূর্ণ হলেই তাকে পরিপূর্ণ বিশ বছর বয়স্ক হিসেবে গণ্য করা হয়। মহাবর্গের ১২৪ অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, কুমারকাশ্যপকে এভাবে গর্ভস্থ মাসগুলো হিসাব করে বিশ বছর বয়সে উপসম্পদা দেয়া হয়েছিল।
যে ব্যক্তি বারমাস মায়ের গর্ভে থেকে প্রবারণার সময়ে ভুমিষ্ঠ হয়, তার উনিশতম বছরের প্রবারণা শেষে পরদিন উপসম্পদা দেয়া যায়। কারণ সে তো গর্ভে এক বছর ছিল, এখন তার জন্মবয়স উনিশ বছর। কাজেই সব মিলিয়ে এই জন্মে তার বয়স হচ্ছে বিশ বছর। কাজেই উপসম্পদা দিতে কোনো বাধা নেই।
প্রাচীন স্থবিরগণ কিন্তু প্রবারণার সময়ে ভূমিষ্ঠ হওয়া উনিশ বছর বয়স্ক শ্রামণকে শ্রাবণী পূর্ণিমার পরদিন উপসম্পদা দেন। সেটা কেন করেন? এক বছরে ছয়টি চতুর্দশী উপোসথ হয়। অর্থাৎ সেখানে ৬x১৫ = ৯০ দিনের জায়গায় হয় ৬x১৪ = ৮৪ দিন। এভাবে বছরে ৬ দিন কমে যায়। ২০ বছরে ৬x২০ = ১২০ দিন বা ৪ মাস ক্ষয় হয়।
রাজাগণ প্রতি তৃতীয় বছরে অধিমাস হিসেবে বর্ষাকে একমাস এগিয়ে আনেন। তাই প্রতি তৃতীয় বছর হয় ১৩ মাসের। এভাবে ১৮ বছরে ৬ মাস বাড়ে। সেখান থেকে ক্ষয় হওয়া ৪ মাস বাদ দিলে থাকে অতিরিক্ত ২ মাস। সেই ২ মাস গ্রহণ করলে বিশ বছর পরিপূর্ণ হয় বলে নিঃসন্দেহ হয়ে প্রবারণা পূর্ণিমার অপেক্ষা না করেই তাকে শ্রাবণী পূর্ণিমার পরের দিন উপসম্পদা দেন।
৩. উপসম্পদার কিছু পূর্বশর্ত
১. উপাধ্যায় ছাড়া উপসম্পদা দেয়া যাবে না। তাই ‘উপজ্ঝাযো মে ভন্তে, হোহী’ বলে উপাধ্যায় গ্রহণ করাতে হয়। উপাধ্যায় ছাড়া যারা এভাবে উপসম্পদা দেয় তাদের দুক্কট অপরাধ হয়। তবে সে ঠিকই ভিক্ষু হয়ে যায়। (মহাবর্গ.১১৭)
২. সঙ্ঘ বা গণকে উপাধ্যায় করা যাবে না। পণ্ডক ইত্যাদি ১১ প্রকার ব্যক্তিকে উপাধ্যায় করা যাবে না। যারা এভাবে উপসম্পদা দেয় তাদের দুক্কট অপরাধ হয়। তবে সে ঠিকই ভিক্ষু হয়ে যায়।(মহাবর্গ.১১৭)
৩. পাত্রচীবর ছাড়া উপসম্পদা দেয়া যাবে না। ধার করা পাত্রচীবর নিয়ে উপসম্পদা দেয়া যাবে না। যারা এভাবে উপসম্পদা দেয় তাদের দুক্কট অপরাধ হয়। তবে সে ঠিকই ভিক্ষু হয়ে যায়।(মহাবর্গ.১১৮)
উপসম্পদাপ্রার্থীর পরিপূর্ণ পাত্রচীবর থাকলে তবেই উপসম্পদা দেয়া উচিত। যদি তার সেগুলো না থাকে তাহলে আচার্য বা উপাধ্যায়ের স্বেচ্ছায় দেয়া উচিত, অথবা অন্য ভিক্ষুরা একদম স্বত্ব ত্যাগ করে পাত্রচীবর দেয়া উচিত। গৃহত্যাগ করে আসা প্রব্রজ্যাপ্রার্থীকে কিন্তু ধার করা পাত্রচীবরেও প্রব্রজ্যা দেয়া যায়।
পোড়ানো হয় নি এমন পাত্র ও চীবর হয় নি এমন বস্ত্র নিয়ে হাজির হলে সেই পাত্র পোড়াতে হবে। চীবরগুলো রেডি করতে হবে। সেগুলো রেডি না হওয়া পর্যন্ত সে বিহারে বাস করতে পারে। তাকে তখন পিণ্ডপাত থেকে খাওয়ার আগে কিছু ভাগ দেয়া যায়, শ্রামণদের প্রাপ্য জিনিসপত্রের ভাগও তাকে দেয়া যায়। তবে বাসস্থান ও নিমন্ত্রণের ভাগগুলো তাকে দেয়া ঠিক নয়। বিকালে তেল, মধু, গুড় ইত্যাদি ভেষজ দ্রব্যাদির ভাগ দেয়া যায়। অসুস্থ হলে তাকে ওষুধ দেয়া যায়। অসুস্থ হলে শ্রামণের মতোই তাকেও তখন দেখাশোনা করা যায়।

6 thoughts on “উপসম্পদার বিবিধ বিষয়

  1. বন্দনা ভান্তে। অনেকদিন পর আপনার এই ওয়ালে আসলাম। উপরোক্ত উপসংহারটি আমার খুব পছন্দ হয়েছে আর সেটা হলো– বুদ্ধের ধর্ম্ম শিক্ষা প্রজ্ঞা ও করুণার। অবিদ্যা (মিথ্যাধারণা থেকে উৎপন্ন দুঃখ) থেকে মুক্তির। চিত্তকে বিশুদ্ধ পন্থায় চালনা করার সোপান। পাড়ি দেবার কাজে যা সকলের জন্য উন্মুক্ত।
    সেখানে নরনারী-লিঙ্গভেদের সুযোগ নেই। আছে অকুশচিত্ত ও কুশলচিত্ত, সঠিক দৃষ্টি ও মিথ্যাদৃষ্টি, লোভ ও নির্লোভ, ভয় ও নির্ভয়ের প্রভেদ। বুদ্ধের এই শিক্ষা একান্তই চিত্ত ও আচরণগত অধ্যায়নের জন্য প্রজ্ঞাপ্ত। কোনো অবস্থাতেই লিঙ্গাধ্যায়নের জন্য নয়। আমিও তাই মনে করি। যদিও ভান্তের ব্যাখাটি পেলে আরো ভাল হতো সঠিকটা বুঝতে। সে যাই হোক ভান্তের কাছে আমার একটি বিনীত প্রশ্ন আছে আর তা হলো ঃ
    বুদ্ধ ধর্ম মতে কর্ম ফল অখন্ডনীয়। একটু সুঁচ খড়ের গাদায় ফেললে যেমন সেটা খুজে পাওয়া কষ্টকর কিংবা বিমান থেকে একটা সুঁচ সাগরের বালুকারাশিতে নিক্ষেপ করলে যেমন খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ঠিক মানব জন্মও নাকি সেরূপ দুস্পাপ্য কিছু। কারণ আমরা জন্মাবার পর থেকেই ভাল কাজের চেয়েও খারাপ কাজ বেশী করি। এবং এই খারাপ কাজের সঞ্চিত পাপরাশি আমাদের জন্মে জন্মে ভোগ করে যেতে হবে? বুদ্ধ কিংবা মোদ্গলায়ন ভান্তেও কর্মফল ভোগ করা থেকে রেহায় পায়নি। তাহলে আমার প্রশ্ন অঙ্গুলিমাল কেনো ৯৯৯ জন মানব হত্যা করেও সেই পাপের ফল ভোগ না করে অরহৎফল লাভ করতে সমর্থ হয়েছিলেন?

    1. এ থেকে এটাই প্রতিয়মান হয় না যে, পাপ এবং পূণ্যের স্রোতধরায়
      যার স্রোতধারা প্রবল সেই স্রোতধারাই তাকে তার গন্তব্যে নিয়ে যায়। যেমন একজন মৃত্যু পথযাত্রী মানুষ সারা জীবন পূণ্য করেও কেন মৃত্যুর পূর্বে খারাপ নিমিত্ত দেখে নরকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে তার কারণ তার অতীতের পাপধারা এইজন্মের পূণ্যের প্রভাব থেকে প্রবল থাকে তাই। আমার এই লেখাটা আপনার ত্রিপিটকের আলোকে যুক্তিসহ উপস্থাপন করলে যদি কোথাও বোঝার ভুল হয় তবে তা শুধরে নেয়ার সুযোগ পাব। বন্দনা ভান্তে। লেখায় কোন অপরাদ করলে ক্ষমা করবেন।

  2. ভান্তে, বন্দনা।
    “#বুদ্ধ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ভিক্ষুণীসংঘ বহু আগেই শ্রীলঙ্কায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে

    #জ্ঞানশান্ত ভিক্ষু, রাজবন বিহার,রাঙ্গামাটি

    সেই কোন আগে একটা পোস্টে লিখেছিলাম পাঅক ভাবনাকেন্দ্রে ভিক্ষুণী আছে৷ সেটার ভিত্তিতে পরবর্তীতে অনেকেই জানতে চেয়েছে মায়ানমারের ভিক্ষুণী ব্যবস্থা সম্পর্কে৷ আমি এখানে যা দেখেছি, শুনেছি এবং জেনেছি তার ভিত্তিতেই এই লেখা৷

    এখানে ভিক্ষুণী আছে বটে, তবে তারা মহাযানী কোরিয়ান ও চাইনীজ ভিক্ষুণী৷ তারা প্রায়ই ভিক্ষুসঙ্ঘকে পিণ্ডদান করে থাকে৷ এখানে থেরবাদী ভিক্ষুণী নেই৷ শ্রামণীও নেই৷ কারণ ভিক্ষুণী বা শ্রামণী হতে হলে প্রথমে কোনো দশ বর্ষা অথবা তার অধিক হয়েছে এমন ভিক্ষুণীর কাছে প্রব্রজ্যা নিয়ে শ্রামণী হতে হয়৷ এরপর ছয়শীলধারী শিক্ষামানা হিসেবে থাকতে হয় দুই বছর৷ এরপর ভিক্ষুণীসঙ্ঘে ভিক্ষুণী হিসেবে উপসম্পদা নিতে হয়৷ পরে ভিক্ষুসঙ্ঘ তাকে আরেকবার উপসম্পদা দেয়৷ এভাবে উভয় সঙ্ঘের কাছে উপসম্পদা বা অনুমোদন দিলে তবেই সে একজন পরিপূর্ণ ভিক্ষুণী হিসেবে গণ্য হয়৷

    বুদ্ধ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ভিক্ষুণীসঙঘ বহু আগেই শ্রীলঙ্কায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে৷ অন্য দেশগুলোতে তো ছিলই না৷ কিন্তু ভিক্ষুসঙ্ঘ কোনোমতে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে৷ তাই বর্তমানে ভিক্ষুসঙ্ঘ আছে, কিন্তু বুদ্ধের প্রবর্তিত ভিক্ষুণীসঙ্ঘ বিলুপ্ত৷ ভিক্ষুণীসঙ্ঘ না থাকায় বর্তমানে তাই শ্রামণী হওয়ারও সুযোগ নেই, ভিক্ষুণী তো দূরের কথা৷ তবুও দেশবিদেশের অনেক ভিক্ষু তাদের নিজেদের মর্জিমাফিক শ্রামণী বা ভিক্ষুণী করাচ্ছেন৷ কিন্তু সেই তথাকথিত শ্রামণী বা ভিক্ষুণীরা বোঝে না যে, তারা বুদ্ধের প্রবর্তিত মহান ভিক্ষুণীসঙ্ঘের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে না, বরং তারা সেই ভিক্ষুদের বিপথগামী চিন্তার শিকার মাত্র৷

    কিন্তু মেয়েদের মনেও তো প্রব্রজ্যা নেওয়ার ইচ্ছা জাগতে পারে৷ তারা কি ব্রহ্মচর্য পালনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত থেকে যাবে? তাদের সেই ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখিয়ে তাদেরকে ব্রহ্মচর্য পালনের সুযোগ করে দিতে বিভিন্ন বৌদ্ধ দেশে বিভিন্ন ব্যবস্থা চালু হয়েছে৷ মায়ানমারে সেরকমই একটা ব্যবস্থা হচ্ছে সেয়ালে হওয়া৷ এখানকার সেয়ালেরা দশ-শীলধারী ব্রহ্মচারিণী৷ তারা কোনো দশ বর্ষা বা ততোধ্ক বয়স্ক ভিক্ষুর কাছ থেকে দশশীল গ্রহণ করে থাকে৷ এছাড়াও তারা ভিক্ষুণী পাতিমোক্ষের নিয়ম অনুসরণ করে থাকে৷ পাঅক সেয়াদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং বিখ্যাত দুজন সেয়ালে হচ্ছেন সেয়ালে দীপঙ্করা (বার্মিজ) এবং সেয়ালে সুশীলা (মালয়েশিয়ান চাইনিজ)৷ তারা পাঅক সেয়াদের কাছ থেকে শমথ ও বিদর্শন ভাবনা শেষে ২০ বছরেরও অধিক সময় ধরে ভাবনা শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন দেশে বিদেশের গৃহীদেরকে৷ কই, তারা তো ভিক্ষুণী হবো, শ্রামণী হবো বলে চেঁচামেচি শুরু করেন নি৷ পাঅক সেয়াদ হচ্ছেন তাদের গুরু৷ পাঅক সেয়াদ বুদ্ধকে যে কীরকম শ্রদ্ধা করেন তা এখানকার পরিবেশ না দেখলে বলে বুঝানো মুশকিল৷ তার নির্দেশনা অনুসরণ করে এই সেয়ালেরা যখন ধ্যান লাভ করেন, কলাপ দেখতে পান তখন তাদের আর বুদ্ধের শিক্ষার প্রতি কোনো অবিশ্বাস থাকে না৷ তখন তারা বুদ্ধের শিক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন, বুদ্ধের নির্দেশিত বিনয়কে তারা বুদ্ধের আদেশ হিসেবেই গ্রহণ করে খুশিমনে ধ্যানসাধনায় এগিয়ে যান৷ অন্যদিকে, যারা বুদ্ধের বিনয়কে মানতে পারে না তাদের মনে ঝড় ওঠে৷ এমন ঝঞ্ঝাবিক্ষুদ্ধ মন নিয়ে তারা বুদ্ধের ধর্মবিনয়ে এগিয়ে যাবে সেটা কি কখনো সম্ভব?”

    সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার আইডিতে এই লেখাটি পোস্ট করা হয়েছে ( https://www.facebook.com/100026211226689/posts/526916131525423 )। এটি কোথায় লিখেছেন ভান্তে?

  3. ভান্তে, বন্দনা।

    “সারমেয়’র দল

    ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু

    অতীতে বুদ্ধ এবং তৎকালীন ভিক্ষু সংঘের অনেক বছর পরে ভারত-বাংলা উপমহাদেশে আমার জানা মতে প্রথমে নারীদের প্রব্রজ্যা দিয়েছিলেন অখিল ভারত ভিক্ষু সংঘের মহামান্য সংঘনায়ক ত্রিপিটক বাগীশ্বর আনন্দমিত্র মহাস্থবির। স্থান পশ্চিম বঙ্গের হুগলী জিলার রিষডাতে। সে সময় তিনি অনেক নারীদের এক সাথে গণ প্রব্রজ্যা দিয়েছিলেন। সে প্রব্রজ্যানুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিম বঙ্গের অনেক বঙ্গীয় ভিক্ষু সংঘ। তারপর আমার দেখাতে মহামান্য ভারতীয় সংঘরাজ ড. রাষ্ট্রপাল মহাথের যখনই প্রার্থী আসতেন নিয়মিত দেশ-বিদেশের নারীদের প্রব্রজ্যা দিতেন বুদ্ধগয়ায়। শ্রদ্ধেয় ভন্তের জীবদ্দশায় যেমন তাঁর অনেক কুশল কর্মের আমি সহভাগী ছিলাম তেমনি তাঁর প্রয়ানের পরও সে ধারা অব্যাহত রাখতে নারীদের প্রব্রজ্যা বুদ্ধগয়ায় এবং অন্যত্রও দিয়েছি। যেখানে দিয়েছি সেখানেই ছিলেন সংঘের উপস্থিতি। এককভাবে দেওয়ার বিনয় সঙ্গতভাবে কোন বাঁধা না থাকলেও সংঘের সম্মুখেই প্রব্রজ্যা দিয়ে এসেছি। শ্রদ্ধেয় আনন্দমিত্র মহাথের এবং শ্রদ্ধেয় ড. রাষ্ট্রপাল মহাথের ও আরও যাঁরা পৃথিবীতে নারীদের প্রব্রজ্যা দিয়েছেন বা দিচ্ছেন তা বুদ্ধ এবং তাঁর শ্রাবক সংঘ তথা অরহত মোগ্গলিপুত্র তিষ্য মহাস্থবিরের পরপম্পরাই অনুসৃত হয়েছে। মোগ্গলীপুত্র তিষ্য থেরোর নেতৃত্বে রাজকুমারী সংঘমিত্রা উপসম্পাদা লাভকরে অরহত্ব প্রাপ্ত হয়ে শ্রীলঙ্কা গিয়ে বুদ্ধ শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাঁর ভাই অরহত মহিন্দ থেরোর সঙ্গে। সেখানে ভিক্ষু সঙ্ঘের সাথে সাথে তাঁরা ভিক্ষুণী শাসনেরও প্রবর্তন করেন। কিন্তু রাজা অশোক শ্রীলঙ্কা ছাড়া অন্য কোথাও ভিক্ষুণী সংঘ প্রেরণ না করায় বার্মা, থাইল্যান্ড আদি দেশে সে ভিক্ষুণী শাসন কখনও প্রতিষ্ঠা হয়নি।

    আমাদের দেশের সারমেয় দলের যাবতীয় ক্ষোভ এবং ক্রোধ কেবল আমার প্রতি কেন তা আমার বোধগম্য নয়। আমি তাঁদের বার বার বলেছি এবং এখনও বলছি আমি তো কোন ধর্ম বিনয়ের বিপক্ষে কাজ করিনি এবং করবও না। বুদ্ধ তো বিনয় দ্বিতীয় খণ্ডের পৃষ্টা ২৭১(PTS সংস্করণ) এ স্পষ্ট শিক্ষাপদ জারী করেছেন-‘

    ‘ ভগবতা পজ্ঞত্তং ভিক্খূহি ভিক্খূনিযো উপসম্পাদেতব্বা’তি’ । অর্থাৎ ভগবান প্রজ্ঞাপ্ত করেছেন যে, ভিক্ষুদের দ্বারা ভিক্ষুনীগণের উপসম্পদা গ্রহণ করা উচিত।’

    একই বিনয় পিটকের দ্বিতীয় খন্ড PTS সংস্করণের ২৭১ পৃষ্টায় বলছেন-‘
    ‘ অনুজানামি, ভিক্খবে, একতো উপসম্পন্নায ভিক্খূণী সঙ্ঘে বিসুদ্ধায ভিক্খূসঙ্ঘে উপসম্পাদন্তি।’

    ভিক্ষুগণ! আমি অনুজ্ঞা প্রদান করছি, যিনি এক পক্ষে অর্থাৎ ভিক্ষুণীসঙ্ঘে প্রশ্নোত্তর পরিস্কার করে বা প্রশ্নোত্তর পর্ব সমাধা করে ভিক্ষুণী উপসম্পাদা গ্রহণ করেছেন তাঁকে উপসম্পাদা প্রদান করবে।’

    এরকম বিনয় পিটকের অনেক উদ্ধৃতি সহকারে আমি ‘ভিক্ষুণী উপসম্পদা ও ইহার বৈধতা’ শিরোনামে বই লিখে সব প্রমাণও দিয়েছি। আমি নারীদের প্রব্রজ্যা দিলেও তারা বৈধভাবে শ্রীলঙ্কা হতে উপসম্পদা গ্রহণ করছেন। তাহলে কেন আমার প্রতি অযথা দোষারোপ?

    সারমেয় দলের কেউ কেউ বলছে তৃতীয় সঙ্গীতিতে এবং কেউ কেউ বলছে ষষ্ঠ সঙ্গীতি ভিক্ষুণী সঙ্ঘ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তৃতীয় না ষষ্ঠ তাও নিশ্চিত করে বলতে পারে না। আমি তাঁদের বলি – আপনারা সঙ্গীতির পুস্তকের উদ্ধৃতি সহকারে যেদিন প্রমাণ দেখাতে পারবেন সেদিনই আমি ক্ষমা চেয়ে ভিক্ষুণী সঙ্ঘ বিলোপ করে নেব। প্রমাণ ছাড়া মুখে বললে তা গৃহীত হবে না। কিন্তু সারমেয়’র দলের এখনও কেউ তা প্রমাণ করতে পারেনি। কেবল দলবদ্ধ হয়ে ঘেউ ঘেউ করে যাচ্ছে।

    কাজেই আমি তো জীবন থাকতে কখনও সারমেয়’র দলে যেতে পারব না জেনে নিন।

    সারমেয়’র দল দন্ড দিয়েছে। আপনারা যদি বৌদ্ধ সাহিত্য অধ্যয়ন করেন তাহলে সেখানে দেখবেন দন্ড শব্দ বুদ্ধের ব্যবহৃত শব্দ নয়। মধ্যম নিকায়ের দ্বিতীয় খন্ডের ‘উপালি সুত্র’দেখুন। সেনাপতি ও গৃহপতি উপালি যখন বুদ্ধ সমীপে উপস্থিত হয়ে তাঁর গুরু নির্গ্রন্থ নাথ পুত্রের কায়দন্ড, বাক্যদন্ড ও মনোদন্ড নীতির কথা বলছেন তাঁকে বুদ্ধ বলছেন- দন্ড শব্দ বলেন না। তথাগতের শিক্ষায় দন্ড শব্দ ব্যবহৃত হয় না। তথাগত কায়কর্ম, বাক্য কর্ম ও মনোকর্মের কথা বলেন। দন্ডের কথা নয়। ‘

    এ উদাহরণে আমরা স্পষ্টত: দেখতে পাচ্ছি দন্ড বুদ্ধ ব্যবহৃত শব্দ নয়। বৌদ্ধোচিতও নয়। তা বুদ্ধভাবনার পরিপন্থী। বুদ্ধজীবনে তিনি কাউকে দন্ডারোপ করেছেন উদাহরণ নাই। তিনি মৈত্রী করুণার সাগর। এ সম্পর্কে পরে আমার বই আসবে।

    এখন সর্বত্র চলছে অতি ধার্মিকতার গড্ডালিকা প্রবাহ। বিচার নাই, বিবেচনা নাই। সব যেন সারমেয় শ্রেণী। এদের কে বুঝাবে? কে বলবে সত্যিকথা? সারমেধ মাহাথেরর দলেই পাল্লাভারী হল সারমেয়দের।”

    পরম শ্রদ্ধেয় বরসম্বোধি ভান্তে লেখাটিতে মহিলাদের প্রব্রজ্যা এবং উপসম্পদা বিষয়ে যা বলেছেন তা কি ধর্মত যথাযথ? এ বিষয়ে বিতর্কের কারণ কী? ধর্মত সঠিক ব্যাখ্যাটাই বা কীরূপ?

  4. ভান্তে, বন্দনা।

    “বুদ্ধত্ব লাভের পরক্ষণেই বুদ্ধের ভিক্ষুণীসংঘ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা:

    লিখেছেন- চন্দন রিমু

    তথাগত বলছেন- ‘আনন্দ, বুদ্ধত্ব প্রাপ্তির পরক্ষণেই একদিন আমি উরুবেলায় নিরঞ্জন নদীর তীরস্থ ন্যাগ্রোধবৃক্ষের তলে বিশ্রাম করছিলাম। ঐ সময় দুষ্ট মার আমার নিকট উপস্থিত হয়ে একপ্রান্তে দাঁড়ালো এবং আমাকে বললো, “সুগত, পরিনির্বাণে প্রবেশ করুন। সুগতের পরিনির্বাণের কাল উপস্থিত হয়েছে”

    আনন্দ, মার এইরূপ বললে, আমি তাকে বলেছি ‘রে দুষ্ট, যতদিন সঙ্ঘভুক্ত ভিক্ষু-ভিক্ষুণীগণ এবং নরনারী নির্বিশেষে গৃহস্থ শিষ্যগণ প্রকৃত শ্রাবক হবেনা, যতদিন তারা উপযুক্তরূপে নিয়ন্ত্রিত, দক্ষ ও সুশিক্ষিত, বৃহত্তর ও ক্ষুদ্রতর কর্তব্য পালন করবে না, যতদিন ধম্মকে আয়ত্ব করে ঐ ধম্ম সম্পর্কে অপরকে শিক্ষাদান করতে পারবে না, উপযুক্ত ব্যাখ্যায় প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না, কেউ মিথ্যা মত প্রচার করলে তাকে পরাভূত করতে পারবেনা এবং বিস্ময়কর সত্যের দূর থেকে দূরে পৌঁছতে পারবেনা ততদিন আমি পরিনির্বাণে প্রবেশ করবো না।‘

    ‘হে দুষ্ট মার, যতদিন পর্যন্ত এই ধম্ম-জ্ঞান বহু মানুষের কাছে বহুদূর পর্যন্ত প্রকাশিত হবেনা, ততদিন আমি পরিনির্বাণে প্রবেশ করবো না।“

    {পরিনির্বাণ সুত্র- দীর্ঘনিকায়।}

    এখানে বিশেষ দৃষ্টিপাত ও বিবেচনা করছি- দীর্ঘনিকায়ের উক্ত ঘটনা বুদ্ধত্ব লাভের পরক্ষণের। যেখানে বুদ্ধ সংকল্প করেছেন ভিক্ষু-ভিক্ষুনী ও গৃহস্থ নরনারীকে গড়ে তুলবেন, ধম্মজ্ঞানে ও সদাচারে সুপ্রশিক্ষিত করবেন। তা না করে পরিনির্বাণে প্রবেশ করবেন না।

    বুদ্ধত্ব লাভের পাঁচবছরের মাথায় মহাপ্রজাপতি গৌতমীর নেতৃত্বে ভিক্ষুণীসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠিত হয়।

    সেসময় ভিক্ষুণীসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বুদ্ধের নামে- বিনয় ও অঙ্গুত্তর নিকায়ে ভিন্ন এক ভাষ্য পাওয়া যায়- তাতে ভিক্ষুণীসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠার জন্য মহাপ্রজাপতি গৌতমীর আবেদন, বুদ্ধের অনিহা, আনন্দের অনুরোধ, পরে ভিক্ষুণীদের উপর আটটি কঠোর শর্তারোপের কথা বর্ণিত হয় (যা ‘অষ্টগুরুধর্ম’ নামে অবহিত), সে শর্তগুলো মহাপ্রজাপতি গৌতমী মেনে নিয়ে ভিক্ষুণীসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠার অনুমোদন লাভ করেন।

    (এই আটটি কঠোর শর্তে প্রথাগত পুরুষতান্ত্রিক মেজাজ, নারীকে ছোট ও অধীন করে রাখার কুৎসিত প্রবণতাই ফুটে উঠেছে। গৃহে যেমন নারীরা গৌণ, অধিকাংশ পুরুষের খবরদারীর অধীনস্থ, অপশাসনের শিকার, অনেকটা সেরকম নিয়ম করেই ভিক্ষুণীদেরকে ভিক্ষুদের অধীনস্থ রাখার কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে শর্তগুলোতে। ভিক্ষুণীসঙ্ঘ গঠনে বুদ্ধের অনিহা, পরে আটটি কঠোর শর্তারোপের মধ্যদিয়ে রাজি হওয়ার ঘটনা যদি সত্য হয়, তাহলে আমাদের বুদ্ধের নরনারী নির্বিশেষে পঞ্চস্খন্ধতত্ত্ব ও অলৈঙ্গিক মহামানবতার বৈশিষ্ট সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে হবে। অন্যান্য ধর্মের প্রবর্তকদের মতো নারীবিষয়ক নীচু দৃষ্টিভঙ্গীর সঙ্গে নারীবিষয়ক বুদ্ধের দৃষ্টিভঙ্গির তফাৎ আদৌ আছে কিনা সে বিষয়ে গবেষণা করতে হবে, এবং মেনে নিতে হবে জাতকের কাহিনীতে নারীসম্পর্কে যতসব অমানবিক নোংরা কথা বুদ্ধ তাঁর অতীত জন্মের কাহিনী হিসেবে শিষ্যদের বলেছেন, তা প্রক্ষিপ্ত নয়, প্রকৃত।)

    এতকিছুর পর বুদ্ধ আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘হে আনন্দ, যদি আমাদের ধম্মশিক্ষায় নারীকে সন্ন্যাস দেওয়া না হতো, তাহলে এই ধম্ম… এত হাজার বছর টিকে থাকত, যেহেতু নারীকে সন্ন্যাসের অধিকার দেওয়া হয়েছে, সেই জন্য এই ধম্ম এত দিন কম টিকবে।‘

    এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি,

    দীর্ঘনিকায় পরিনির্বাণ সূত্রে উল্লেখিত বুদ্ধত্ব লাভের পরক্ষণের কথার সাথে পাঁচবছর পরে বুদ্ধের কথার সুস্পষ্ট বিরোধ।

    আমরা জিজ্ঞাসা করি, স্ববিরোধপূর্ণ এই বাক্যলাপ বুদ্ধের, নাকি ত্রিপিটক রচয়িতার? যা নিয়ে বৌদ্ধপুরোহিতের বিশাল একটি অংশ নারীদের অনাগারিক জীবনলাভে বাধা ও নিন্দার গল্প প্রচার করছেন।

    যদি প্রশ্ন করা হয়, দির্ঘনিকায়ের সাথে বিনয় ও অঙ্গুত্তর নিকায়ের মধ্যে যে গড়মিল দেখা যাচ্ছে, এর সমাধান কীরূপ? কোন ভাষ্যটি গ্রহণীয়, কোনটি বর্জনীয়? উত্তর কী হবে?

    প্রশ্নটি সজাগ রেখে ভিন্ন একটি আলোকে উত্তর সন্ধান করা যাক-

    মহাপ্রজাপতি গৌতমীর আবেদন, ভিক্ষুণীসঙ্ঘ গঠনে বুদ্ধের অনিহা এবং ভিক্ষুণীদের উপর আগাম (অট্টগুরুধর্ম) শর্তারোপ- এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ধর্মানন্দ কোসম্বী, ভগবান বুদ্ধ নামক গ্রন্থে যে অসাধারণ মন্তব্যটি করেছেন, সেটি এখানে উল্লেখ করছি-

    ‘বিনয় ও অঙ্গুত্তর নিকায়ে এই ঘটনার বর্ণনা একই রকম থাকলেও, এই আটটি কঠোর ধর্ম (গুরুধর্ম) পরে রচিত হয়েছে, এরূপ বলতে হবে। কারণ, বিনয় নীতি নির্ধারণ করবার সময় বুদ্ধ যে-পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন, তার সাথে বর্তমান নিয়মগুলোর স্পষ্ট বিরোধ আছে।‘

    ‘বুদ্ধ বেরঞ্জাগ্রামের নিকট থাকতেন। ঐ সময় বেরঞ্জার আশেপাশে দুর্ভিক্ষ ছিল বলে ভিক্ষুদের খুব কষ্ট হচ্ছিল। তখন সারিপুত্র বুদ্ধকে অনুরোধ করেছিলেন যে, আচার-বিচার সম্বন্ধে ভিক্ষুদের জন্য নিয়ম বেঁধে দেওয়া হউক। বুদ্ধ বললেন, ‘হে সারিপুত্র, তুমি একটু থামো। কখন নিয়ম বেঁধে দেওয়া দরকার, তা তথাগতের জানা আছে। যতদিন পর্যন্ত সঙ্ঘে কোনোরকম অকুশল প্রবেশ না করে, ততদিন পর্যন্ত ঐরূপ অকুশল নিবারণ করবার জন্য তথাগত কোনো নিয়ম (বিনয় বিধান) করেন না।‘

    বুদ্ধের এই উক্তি অনুসারেই সঙ্ঘের সর্বনিয়ম (বিনয়) রচিত হয়েছিল। প্রথম কোনো ভিক্ষু কিছু একটা অপরাধ অথবা ভুল করতেন, আর সেই কথা বুদ্ধের কানে আসলে, তিনি ভিক্ষুসঙ্ঘের সভা করে, দুই-একটি নিয়ম প্রবর্তন করতেন।

    কিন্তু (পূর্বোক্ত কাহিনীতে) মহাপ্রজাপতি গৌতমীর ব্যাপারে এই পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়নি। ভিক্ষুণীসঙ্ঘের কোনো দোষ ঘটে নাই, তার আগেই ভিক্ষুণীদের উপর এই আটটি নিয়ম চাপানো হয়েছে। এটা বিলক্ষণ বলে মনে হয়। সুতরাং অনুমান করা যায় যে, বুদ্ধের পরিনির্বাণের পর, ভিক্ষুসঙ্ঘ নিজের হাতে সকল ক্ষমতা রেখে দেবার জন্য এইসব নিয়ম করে বিনয়ে এবং অঙ্গুত্তরনিকায়ে ঢুকিয়েছে।‘

    ======

    উপসংহার: বুদ্ধের ধম্মশিক্ষা প্রজ্ঞা ও করুণার। অবিদ্যা (মিথ্যাধারণা থেকে উৎপন্ন দুঃখ) থেকে মুক্তির। চিত্তকে বিশুদ্ধ পন্থায় চালনা করার সোপান। পাড়ি দেবার কাজে যা সকলের জন্য উন্মুক্ত।

    সেখানে নরনারী-লিঙ্গভেদের সুযোগ নেই। আছে অকুশচিত্ত ও কুশলচিত্ত, সঠিক দৃষ্টি ও মিথ্যাদৃষ্টি, লোভ ও নির্লোভ, ভয় ও নির্ভয়ের প্রভেদ। বুদ্ধের এই শিক্ষা একান্তই চিত্ত ও আচরণগত অধ্যায়নের জন্য প্রজ্ঞাপ্ত। কোনো অবস্থাতেই লিঙ্গাধ্যায়নের জন্য নয়।

    প্রকৃত বোধির জাগ্রত হতে, পূর্ণমানবের পথ চলতে পূর্বানুমান ও অপরীক্ষিত সংস্কারছিন্ন করতে হয়, মিথ্যাধারণা ও দোহাই পরিহার করতে হয়। একই মাটি জলে, আলো ও বাতাসে স্বাধীনতা-সম্মান ও সমতার সাথে নরনারী নির্বিশেষে অংশগ্রহণের সুযোগ অবারিত রাখতে হয়।

    সমস্ত সুযোগ পেয়ে গেলেই যে ভিক্ষু-ভিক্ষুণীসহ গৃহস্থ নর-নারী সবাই আলোকিত হয়ে যাবেন, তা নয়। নিজ নিজ প্রচেষ্টায় দক্ষতার ছাপ রেখে স্বীয় পথে চলবেন। নিজ নিজ ত্রুটি, স্খলন মোকাবেলা করে, সকলের প্রতি ক্ষমা ও সহানুভূতির হাত প্রসারিত রেখে, অন্ধকার থেকে আলোতে, আলো থেকে আলোতে চলার চোখ, শ্রদ্ধা ও সাহস উৎপন্ন করবেন। বুদ্ধের প্রকৃত শিক্ষার মেজাজ গভীরভাবে উপলবদ্ধি হলে কেবল এরূপ নীতিই দৃশ্যমান হতে থাকে।

    তবুও বুদ্ধের শিক্ষায় নারী ও লিঙ্গনিন্দার প্রচার হতে দেখলে সকলে দায়িত্ব নিয়ে বলুন- এটি মানবতাবিরোধী যেকোনো অপরাধের সমান অপরাধ। এইরূপ অপরাধের সঙ্গে বুদ্ধের নাম জড়ানো হলে, প্রকৃত পক্ষে বুদ্ধ ও তাঁর শিক্ষায় আবর্জনা নিক্ষেপ করা হয়।”

    এই লেখাটি ধর্মত কতটুকু সঠিক? ধর্মত যথাযথ ব্যাখ্যাটি কীরূপ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *