আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

স্বর্গ নরকের অবিশ্বাসীদের জন্য পায়াসি সুত্রের সারসংক্ষেপ

আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা পুনর্জন্ম এবং কর্ম ও কর্মফলকে বিশ্বাস করেন না। বৌদ্ধধর্মমতে তারা হলেন গিয়ে ঘোর মিথ্যাদৃষ্টি পরায়ণ ব্যক্তি। তাদের অনেকের সাথে আমার কথা হয়। তারা তাদের বিশ্বাস অবিশ্বাসের কথা আমাকে জানান। আমার তখন মনে পড়ে পায়াসি রাজার কথা। বুদ্ধের আমলে পায়াসি রাজাও এমন ছিলেন। তিনিও পুনর্জন্ম এবং কর্ম-কর্মফলকে বিশ্বাস করতেন না। তিনি চাইতেন প্রমাণ।
তাই তিনি একদিন কুমারকাশ্যপ স্থবিরের সাথে দেখা করে বললেন, ‘মাননীয় কাশ্যপ, আমি বিশ্বাস করি যে ইহকাল পরকাল বলে কিছু নেই, কর্মের ফল নেই।’
তখন কুমারকাশ্যপ বললেন, ‘হে রাজা, তাহলে আমি আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করি। আপনার যেমনটা মনে হয় উত্তর দেবেন। বলুন তো, এই চন্দ্র সূর্য কি ইহলোকে? নাকি পরলোকে? সেগুলো কি দেবতা নাকি মানুষ?’
রাজা ভাবলেন, এখন যদি চন্দ্রসূর্য ইহলোকে বলি, তাহলে জিজ্ঞেস করবে ইহলোকে তারা কোথায় থাকে? তাদের আয়তন কত? তাদের উচ্চতা কত? এভাবে প্রশ্নের জালে জড়িয়ে ফেলবে। সেগুলো আমি জবাব দিতে পারব না। তাই চন্দ্রসূর্য পরলোকে বলাটাই ভালো হবে।
এছাড়াও বুদ্ধ এর কিছুদিন আগেই সুধাভোজন জাতক (৫৩৫ নম্বর জাতক) বলেছিলেন। সেটাতে তিনি বলেছিলেন, চাঁদে চাঁদ দেবপুত্র থাকে, সূর্যে সূর্য দেবপুত্র থাকে। সেই জাতক অল্পদিনেই লোকজনের মুখে মুখে ছড়িয়ে গিয়েছিল। এভাবে লোকজন সবাই জেনে গিয়েছিল যে চন্দ্রসূর্যে দেবতা থাকে। তাহলে রাজা কীভাবে বলবেন চাঁদে কোনো দেবতা নেই?
এভাবে চিন্তা করে তাই তিনি কুমারকাশ্যপ ভান্তেকে জবাব দিলেন, মাননীয় কাশ্যপ, চন্দ্রসূর্য হচ্ছে পরলোকে। ইহলোকে নয়। তারা দেবতা। তারা মানুষ নয়।
তখন কুমারকাশ্যপ ভান্তে বললেন, হে রাজা, একারণেই পরলোক আছে। দেবতা আছে, কর্মের ফল আছে।
কিন্তু পায়াসি রাজা একগুঁয়ের মতো তার আগের মতই ধরে থাকলেন। তখন কুমারকাশ্যপ ভান্তে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কী কারণে আপনি বলেন যে পরলোক নেই, দেবতা নেই, কর্মের ফল নেই?
তখন পায়াসি রাজা বললেন, ‘মাননীয় কাশ্যপ, আমার অনেক বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজন আছে যারা প্রাণিহত্যা, চুরি, ব্যভিচার ইত্যাদি দুনিয়ার সব পাপকর্ম করে বেড়ায়। পরে তারা অসুস্থ হয়ে মরমর হলে আমি তাদের কাছে গিয়ে বলি, “কেউ কেউ বলে প্রাণিহত্যা ইত্যাদি পাপকর্ম করলে নাকি মরণের পরে নরকে দুর্গতিতে যেতে হয়। আপনিও তো এমন অনেক পাপকাজ করেছেন। তাদের কথা সত্য হলে আপনিও নরকে যাবেন। নরকে যদি যান তাহলে একটু আমাকে এসে বলে যাবেন যে, পরলোক আছে। দেবতা আছে। কর্মের ফল আছে। আমি আপনার কথাতেই বিশ্বাস করব।’ সে তখন ঠিক আছে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু মরার পরে তার আর কোনো খবর থাকে না। সে নিজেও আসে না, কারো মাধ্যমেও কোনো খবর পাঠায় না। এ থেকেই আমি বলি যে, পরলোক নেই, দেবতা নেই। কর্মের ফল নেই।’
তখন কুমারকাশ্যপ ভান্তে তার জবাবে একটা উপমা দিলেন এভাবে, ‘হে রাজা, ধরা যাক একজন ডাকাতকে ধরে আপনার কাছে নিয়ে আসা হলো বিচারের জন্য। আপনি বললেন, একে দড়ি দিয়ে পিছনে হাতমোড়া করে শক্তভাবে বাঁধ। মাথা ন্যাড়া করে দাও। তারপর পথেপথে, চত্বরে চত্বরে ঢাকঢোল বাজিয়ে তাকে ঘোরাও। এরপর নগরের দক্ষিণ দরজা দিয়ে বের করে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাও। সেখানে তার শিরচ্ছেদ কর।’ রাজকর্মচারীরা তখন আপনার আদেশ মোতাবেকই তাকে বধ্যভূমিতে নিয়ে গেল। এখন সেই ডাকাত যদি বলে, “মহোদয়গণ, অমুক গ্রামে বা গঞ্জে আমার বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজন আছে। আমি তাদেরকে একটু বলে আসি। ততক্ষণ পর্যন্ত আপনারা অপেক্ষা করুন।” এমন বললে জল্লাদরা কি তাকে সেই সুযোগ দেবে? নাকি শিরচ্ছেদ করবে?’
রাজা স্বীকার করলেন যে সেই ডাকাতের এমন সুযোগ পাওয়ার প্রশ্নই আসে না। তখন কুমারকাশ্যপ ভান্তে বললেন, ‘হে রাজা, ইহকালে জল্লাদেরা মানুষ হয়েও এমন সুযোগ দেয় না। তাহলে আপনার যেসব আত্মীয়স্বজন প্রাণিহত্যা, চুরি ও ব্যভিচার করে; মিথ্যা, বিভেদমূলক, কর্কশ ও অনর্থক বাক্য বলে; অন্যের জিনিস লোভ করে, প্রতিশোধপরায়ণ, ও মিথ্যাদৃষ্টি সম্পন্ন হয়, তারা যখন মরণের পরে নরকে উৎপন্ন হয় তখন কি তারা নরকের কর্মচারীদের কাছ থেকে সেই সুযোগ পাবে? না, সুযোগ পাবে না। এই কারণেও পরলোক আছে। দেবতা আছে, কর্মের ফল আছে।’
রাজা তখন বললেন, ‘মাননীয় কাশ্যপ, আপনি এমন বললেও আমি কিন্তু বলি যে, পরলোক নেই, দেবতা নেই, কর্মের ফল নেই। দেখুন, আমার কোনো কোনো আত্মীয়স্বজন আছে যারা পাপকাজ থেকে বিরত থাকে। তারা একসময় অসুস্থ হয়ে মরমর হয়। তখন আমি তাদের কাছে গিয়ে বলি, কোনো কোনো শ্রমণ ব্রাহ্মণ বলেন যে প্রাণিহত্যা ইত্যাদি পাপকর্ম থেকে বিরত হলে তারা মরণের পরে স্বর্গে উৎপন্ন হবে। আপনিও তো পাপকর্ম থেকে বিরত ছিলেন। সেই শ্রমণ ব্রাহ্মণদের কথা যদি সত্য হয় তাহলে আপনিও মরণের পরে স্বর্গে জন্মাবেন। যদি স্বর্গে যান, তাহলে একটু আমাকে এসে বলে যাবেন যে পরলোক আছে, দেবতা আছে, কর্মের ফল আছে। আপনার কথা আমি বিশ্বাস করব। সে তখন ঠিক আছে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু মরার পরে তার আর কোনো খবর থাকে না। সে নিজেও আসে না, কারো মাধ্যমেও কোনো খবর পাঠায় না। এ থেকেই আমি বলি যে, পরলোক নেই, দেবতা নেই। কর্মের ফল নেই।’
এর জবাবে কুমারকাশ্যপ ভান্তে একটা উপমা দিলেন, ‘হে রাজা, ধরা যাক কোনো লোক পায়খানার গর্তে ডুবে গেছে। আপনি বললেন, এই কে কোথায় আছ? যাও, তাকে পায়খানার গর্ত থেকে তুলে আন। তারা তাকে সেখান থেকে তুলে আনল। বাঁশের ফালি দিয়ে তার গায়ে লেগে থাকা পায়খানাগুলো ছেঁচে ফেলে দিল। হলদে বর্ণের মাটি দিয়ে তার সারা দেহ তিনবার মেখে দিল। এরপর তেল মেখে দিয়ে সুবাসিত মিহি স্নানচুর্ণ দিয়ে তিনবার তাকে ভালোমতো গোসল করাল। তার চুল দাঁড়ি আঁচড়ে দিল। এরপর তাকে দামী দামী অলঙ্কার, প্রসাধনী ও পোশাক দিয়ে সাজাল। এরপর তাকে প্রাসাদে বসিয়ে সব ধরনের ভোগসুখে রত করাল। হে রাজা, সেই ব্যক্তি এখন ভালোমতো স্নান করেছে, চুলদাঁড়ি আঁচড়ে নিয়েছে, প্রসাধনী দিয়ে সেজেছে, শ্বেতশুভ্র পোশাক পরেছে, প্রাসাদের উপরে বসে পঞ্চ কাম্যসুখ উপভোগ করছে। এমন অবস্থায় তার কি সেই পায়খানার গর্তে আবার ডুব দেয়ার ইচ্ছা হবে? হবে না। কেন হবে না? কারণ সেই পায়খানার গর্ত হচ্ছে অশুচি, দুর্গন্ধময়, ঘৃণ্য।
ঠিক তেমনিভাবে মানুষেরা হচ্ছে দেবতাদের কাছে অশুচি, দুর্গন্ধময় ও ঘৃণিত। শত যোজন দূর থেকেও মানুষের গন্ধে দেবতারা ত্যক্তবিরক্ত হয়। আপনার আত্মীয়স্বজন প্রাণিহত্যা ইত্যাদি পাপকর্ম থেকে বিরত হয়ে মরণের পরে স্বর্গে দেবতা হিসেবে উৎপন্ন হলে তখন কেন তাদের আবার এই অশুচি ও দুর্গন্ধময় মনুষ্যলোকে ফিরে আসার ইচ্ছা জাগবে বলুন তো? এই কারণেও পরলোক আছে। দেবতা আছে, কর্মের ফল আছে।’
কিন্তু রাজা আবার বললেন, ‘মাননীয় কাশ্যপ, আপনি এমন বললেও আমি কিন্তু বলি যে, পরলোক নেই, দেবতা নেই, কর্মের ফল নেই। দেখুন, আমার কোনো কোনো আত্মীয়স্বজন আছে যারা পাপকাজ থেকে বিরত থাকে। তারা একসময় অসুস্থ হয়ে মরমর হয়। তখন আমি তাদের কাছে গিয়ে বলি, কোনো কোনো শ্রমণ ব্রাহ্মণ বলেন যে প্রাণিহত্যা ইত্যাদি পাপকর্ম থেকে বিরত হলে তারা মরণের পরে তাবতিংস স্বর্গে উৎপন্ন হয়। আপনিও তো পাপকর্ম থেকে বিরত ছিলেন। সেই শ্রমণ ব্রাহ্মণদের কথা যদি সত্য হয় তাহলে আপনিও মরণের পরে তাবতিংস স্বর্গে দেবতা হয়ে জন্মাবেন। যদি স্বর্গে যান, তাহলে একটু আমাকে এসে বলে যাবেন যে পরলোক আছে, দেবতা আছে, কর্মের ফল আছে। আপনার কথা আমি বিশ্বাস করব। সে তখন ঠিক আছে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু মরার পরে তার আর কোনো খবর থাকে না। সে নিজেও আসে না, কারো মাধ্যমেও কোনো খবর পাঠায় না। এ থেকেই আমি বলি যে, পরলোক নেই, দেবতা নেই। কর্মের ফল নেই।’
তখন কুমারকাশ্যপ ভান্তে বললেন, ‘হে রাজা, মানুষের একশ বছরে তাবতিংস দেবতাদের একদিন বা ২৪ ঘন্টা হয়। সেরকম ৩০ দিনে এক মাস। ১২ মাসে ১ বছর হয়। সেরকম দিব্য ১০০০ বছর হচ্ছে তাবতিংস দেবতাদের আয়ু। এখন আপনার আত্মীয়স্বজন যারা প্রাণিহত্যা ইত্যাদি পাপকাজ থেকে বিরত হয়ে তাবতিংস স্বর্গে দেবতা হিসেবে উৎপন্ন হয় তাদের হয়তো মনে হতে পারে, “আগে দুই তিনদিন একটু দিব্য কামসুখ ভোগ করে নিই। তারপর না হয় পায়াসি রাজাকে গিয়ে বলব।” তখন কি তারা দুতিন দিন পরে এসে বলার সুযোগ পাবে? পাবে না। কেন পাবে না? কারণ তাদের দুতিন দিনে তো এদিকে দুই তিনশ বছর চলে যাবে। তখন রাজা বহু আগেই মরে যাবেন। রাজা মরে গেলে তারা কার কাছে এসে বলবে? এই কারণেও পরলোক আছে। দেবতা আছে, কর্মের ফল আছে।’
তখন রাজা বললেন, ‘মাননীয় কাশ্যপ, আপনি বলছেন তাবতিংস দেবতা আছে, তাবতিংস দেবতারা দীর্ঘায়ু। আমি আপনার কথা বিশ্বাস করি না।’
তা শুনে কুমারকাশ্যপ ভান্তে বললেন, ‘জন্মান্ধ ব্যক্তি যে কোনোদিন সাদা বা কালো, লাল, নীল, হলুদ কোনোকিছু দেখে নি, আকাশের তারা দেখে নি, চন্দ্রসূর্য দেখে নি সে যদি বলে, সাদাকালো, লাল-নীল-হলুদ বলতে কোনোকিছু নেই। আকাশের তারা নেই। চন্দ্রসূর্য নেই। সেগুলোকে দেখেছে এমন কেউ নেই। যেহেতু আমি সেগুলো দেখি না, আমি জানি না সেগুলো দেখতে কেমন, তাই সেগুলো বাস্তবে নেই। এমন বললে সে কি সঠিক কথা বলে? বলে না। কারণ সাদাকালো, লাল নীল, হলুদ এগুলো তো বাস্তবে আছে। আকাশের তারা, চন্দ্রসূর্য বাস্তবে আছে। তাই কেউ যদি বলে, আমি দেখি নি, আমি জানি না সেগুলো দেখতে কেমন, তাই নিশ্চয়ই সেগুলো বাস্তবে নেই। তার এমন বলাটা সঠিক নয়।’
তখন রাজা বললেন, ‘আপনাকে কে বলেছে যে তাবতিংস দেবতা আছে? কে বলেছে তাবতিংস দেবতারা দীর্ঘায়ু? আমরা আপনার কথায় বিশ্বাস করি না।’
কুমারকাশ্যপ ভান্তে বললেন, ‘হে রাজা, আপনি মনে করেছেন পরলোককে মাংসচোখে দেখা যায়। পরলোককে কিন্তু সেভাবে দেখা যায় না। যেসমস্ত শ্রমণ ব্রাহ্মণ বনে অরণ্যে নির্জনে বাস করেন, তারা সেখানে অপ্রমত্ত হয়ে ধ্যান করে দিব্যচোখের অধিকারী হন। তারা বিশুদ্ধ দিব্য চোখে ইহলোক ও পরলোকের প্রাণিদেরকে দেখেন, দেবতাদেরকেও দেখেন। এভাবেই পরলোককে দেখতে হয়।’
রাজা আবার বললেন, ‘মাননীয় কাশ্যপ, আমি দেখি যে শীলবান শ্রমণ ব্রাহ্মণরা বাঁচতেই চান, মরতে চান না। তারা সুখ কামনা করেন, দুঃখকে তারা এড়িয়ে চলতে চান। তারা যদি জানতেন যে সুগতি স্বর্গ আছে তাহলে তো তারা নিশ্চয়ই বলতেন যে এখানে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো। এতে যারা শীলবান তারা বিষ খেতেন, ছুরি দিয়ে আত্মহত্যা করতেন, ফাঁসিতে ঝুলতেন, অথবা উঁচু ঢাল থেকে লাফ দিয়ে মরতেন। কই? তারা তো সেরকম করেন না। নিশ্চয়ই তারা জানেন না যে স্বর্গ আছে। তাই তারা ইহকালেই বেঁচে থাকতে চান, সুখ চান। একারণেই আমি বলি পরলোক নেই। দেবতা নেই। কর্মের কোনো ফল নেই।’
তখন কুমারকাশ্যপ ভান্তে বললেন, ‘হে রাজা, আপনি মুর্খ ও অজ্ঞ হয়ে যেভাবে নয় সেভাবে পরলোক খুঁজতে গিয়ে নিজেই বিনষ্ট হবেন। হে রাজা, শীলবান শ্রমণ ব্রাহ্মণগণ অপক্ক জিনিসকে পরিপক্ক করেন না। বরং পরিপক্ক হওয়ার জন্য অপেক্ষা করেন। শীলবান শ্রমণ ব্রাহ্মণগণের বেঁচে থাকাটা মঙ্গলকর। যেখানে যেখানে শীলবান শ্রমণ ব্রাহ্মণগণ দীর্ঘকাল ধরে অবস্থান করেন সেখানে দেবতা ও মানুষজনের বহু পুণ্য হয়।’
তখন রাজা আবার বললেন, ‘‘মাননীয় কাশ্যপ, আপনি এমন বললেও আমি কিন্তু বলি যে, পরলোক নেই, দেবতা নেই, কর্মের ফল নেই। দেখুন মাননীয় কাশ্যপ, লোকজন যদি কোনো ডাকাতকে ধরে ফেলে তখন তারা আমার কাছে নিয়ে আসে বিচারের জন্য। তখন আমি বলি, তাহলে একে জীবন্ত অবস্থায় হাঁড়িতে ঢুকিয়ে হাঁড়ির মুখ বন্ধ করে দাও। এরপর হাঁড়িটাকে কাঁচা চামড়া দিয়ে মুড়িয়ে সেটার উপর কাদামাটির পুরু আস্তরণ দিয়ে দাও। এরপর সেটাকে চুলায় বসিয়ে দিয়ে আগুন দাও। তারা আমার কথামতো সেভাবে করার পরে মুখবন্ধ হাঁড়িটাকে চুলার আগুনে বসিয়ে দেয়। এরপর যখন মনে হয় লোকটা মারা গেছে, তখন হাঁড়িটাকে চুলা থেকে নামিয়ে হাঁড়ির মুখটা ধীরে ধীরে খুলে দিয়ে সতর্কতার সাথে দেখি প্রাণটা কোনদিক দিয়ে বের হয়। কিন্তু আমরা হাঁড়ির ভেতর থেকে কোনো প্রাণকেই বের হতে দেখি না। একারণেই আমি বলি পরলোক নেই। দেবতা নেই। কর্মের কোনো ফল নেই।’
তখন কুমারকাশ্যপ ভান্তে রাজাকে বললেন, ‘আচ্ছা। আপনি যখন দিনে ঘুমিয়ে পড়েন তখন স্বপ্নে সুন্দর বাড়ি, সুন্দর বন, সুন্দর মাঠ, সুন্দর পুকুর দেখেন কি?’
‘হ্যাঁ, দেখি তো।’
‘আপনার ঘুমানোর সময়ে কি রক্ষীরা আপনার পাহারায় নিয়োজিত থাকে?’
‘হ্যাঁ। থাকে তো।’
‘তারা কি তখন আপনার প্রাণকে ঢুকতে বা বেরোতে দেখে?’
‘না, তেমনটা দেখে না।’
‘তারা আপনার মতো জলজ্যান্ত ব্যক্তির প্রাণকে পর্যন্ত ঢুকতে বা বেরোতে দেখতে পায় না। আর মৃতব্যক্তির প্রাণকে কীভাবে ঢুকতে বা বেরোতে দেখবে?’
তখন রাজা বললেন, ‘মাননীয় কাশ্যপ, আপনি এমন বললেও আমি কিন্তু বলি যে, পরলোক নেই, দেবতা নেই, কর্মের ফল নেই। মাননীয় কাশ্যপ, লোকজন যখন কোনো ডাকাতকে ধরে ফেলে তখন তারা আমার কাছে নিয়ে আসে বিচারের জন্য। তখন আমি বলি, তাহলে তোমরা একে জীবন্ত অবস্থায় দাঁড়িপাল্লাতে তুলে মেপে দেখ। এরপর তাকে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলে পুনরায় দাঁড়িপাল্লাতে মেপে দেখ। তারা এভাবে ওজন মেপে দেখে যে, জীবন্ত অবস্থায় লোকটি হালকা ছিল, নমনীয় ছিল। অথচ মরার পরে সে যেন আরো ভারী হয়েছে, আরো শক্ত হয়েছে। একারণেই আমি বলি পরলোক নেই। দেবতা নেই। কর্মের কোনো ফল নেই।’
কুমারকাশ্যপ ভান্তে তখন রাজাকে একটা উপমা দিলেন এভাবে, ‘হে রাজা, ধরা যাক কোনো এক ব্যক্তি গনগনে তপ্ত লোহার গোলককে দাঁড়িপাল্লাতে মাপল। এরপর সেটিকে ঠাণ্ডা হতে দিল। ঠাণ্ডা হওয়ার পরে আবার সেটিকে দাঁড়িপাল্লায় তুলে মাপল। আপনার কি মনে হয়, কখন সেটি হালকা হয়? গরম অবস্থায়? নাকি ঠাণ্ডা অবস্থায়?’
‘গরম অবস্থাতেই সেটি হালকা হয়। ঠাণ্ডা অবস্থাতে সেটি ভারী হয়।’
‘হে রাজা, ঠিক এভাবেই এই দেহে যখন আয়ু, তাপ ও বিজ্ঞান থাকে, তখন এটি হালকা ও নমনীয় থাকে। কিন্তু যখন আয়ু থাকে না, তাপ ও বিজ্ঞান থাকে না, তখন এই দেহও ভারী হয়ে যায়, শক্ত হয়ে যায়।’
তখন রাজা বললেন, ‘মাননীয় কাশ্যপ, আপনি এমন বললেও আমি কিন্তু বলি যে, পরলোক নেই, দেবতা নেই, কর্মের ফল নেই। মাননীয় কাশ্যপ, লোকজন যখন কোনো ডাকাতকে ধরে ফেলে তখন তারা আমার কাছে নিয়ে আসে বিচারের জন্য। তখন আমি বলি, তাহলে তোমরা একে এমনভাবে মেরে ফেল যাতে এর চামড়া, মাংস ও হাড়গোড়ের কোনো ক্ষতি না হয়। তারা যখন সেই লোকটিকে আধমরা বানিয়ে ফেলে তখন আমি বলি, তাহলে একে ধরে চিৎ করে শুইয়ে দাও। আমরা তার প্রাণ বের হতে দেখব। কিন্তু আমরা তা দেখি না। তখন আমি বলি, তাহলে একে ধরে উপুড় কর… একপাশে কাত কর… অন্যপাশে কাত কর… সোজা করে দাঁড় করাও… উল্টো করে রাখ… হাত দিয়ে বাড়ি মারো… পাথর দিয়ে বাড়ি মারো… লাঠি দিয়ে বাড়ি মারো… ধারালো অস্ত্র দিয়ে বাড়ি মারো… ওপাশে বাড়ি মারো … এপাশে বাড়ি মারো… এদিক ওদিক বাড়ি মারো। আমরা তার প্রাণ বের হতে দেখব। কিন্তু আমরা তার প্রাণকে বের হতে দেখি না। একারণেই আমি বলি পরলোক নেই। দেবতা নেই। কর্মের কোনো ফল নেই।’
তখন কুমারকাশ্যপ ভান্তে রাজাকে বললেন, ‘তাহলে হে রাজা, আপনাকে একটা উপমা দিই। অতীতে এক লোক একটা শঙ্খ নিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়েছিল। সে সেখানকার এক গ্রামের মাঝে দাঁড়িয়ে তিনবার শঙ্খ বাজিয়ে মাটিতে রেখে দিল। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষেরা সেই শব্দ শুনে এসে লোকটিকে জিজ্ঞেস করল, “এই যে, এত সুন্দর, সুমধুর মুর্ছনার শব্দ। কে করে এমন শব্দ?” তখন লোকটি বলল, “এর নাম হচ্ছে শঙ্খ। এর শব্দই হচ্ছে সুন্দর, সুমধুর মুর্ছনা।” তার কথা শুনে লোকজন তখন শঙ্খটিকে চিৎ করে শুইয়ে দিয়ে বলল, “এই শঙ্খ, কথা বল। এই শঙ্খ কথা বল।” কিন্তু শঙ্খ কোনো শব্দ করল না। তারা সেটাকে উপুড় করল, এদিক ওদিক কাত করল, সোজা করে দাঁড় করাল, উল্টো করে দাঁড় করাল, হাত দিয়ে বাড়ি মারল, পাথর দিয়ে বাড়ি মারল, লাঠি দিয়ে বাড়ি মারল, ধারালো অস্ত্র দিয়ে বাড়ি মারল, ওপাশে বাড়ি মারল, এপাশে বাড়ি মারল, এদিক ওদিক বাড়ি মেরে বলল, “এই শঙ্খ, কথা বল। এই শঙ্খ কথা বল।” কিন্তু শঙ্খ কোনো শব্দ করল না।
তখন লোকটি মনে মনে বলল, প্রত্যন্ত অঞ্চলের লোকজন কীরকম মুর্খ। যেভাবে নয় সেভাবে শঙ্খশব্দ খুঁজে বেড়াচ্ছে।’ সে তখন শঙ্খটি হাতে নিয়ে তিনবার শঙ্খ বাজিয়ে চলে গেল। লোকজন তা দেখে বুঝল, যখন এই শঙ্খের সাথে ঐ লোকটি থাকে, প্রচেষ্টা থাকে, বাতাস থাকে, তখন এটি শব্দ করে। তা নাহলে এটি শব্দ করে না।
ঠিক তেমনিভাবে হে রাজা, এই দেহে যখন আয়ু, তাপ ও বিজ্ঞান থাকে, তখন এই দেহ আসা যাওয়া করে, দাঁড়ায়, বসে, শুয়ে পড়ে, চোখে দেখে, কানে শোনে, নাকে গন্ধ পায়, জিহ্বায় স্বাদ পায়, দেহে স্পর্শ পায়, মনে বিষয়গুলোকে জানে। কিন্তু এই দেহে যখন আয়ু, তাপ ও বিজ্ঞান থাকে না, তখন আর এই দেহ সেই কাজগুলো করতে পারে না।
হে রাজা, আপনি মুর্খ ও অজ্ঞ হয়ে যেভাবে নয় সেভাবে পরলোকের অনুসন্ধান করছেন। এমন পাপমূলক দৃষ্টিভঙ্গি পরিত্যাগ করুন। এমন পাপমূলক দৃষ্টিভঙ্গি আপনার দীর্ঘকাল অকল্যাণ ও দুঃখের কারণ না হোক।’
তখন রাজা বললেন, ‘মাননীয় কাশ্যপ, আপনি এমন বললেও আমি এমন দৃষ্টিভঙ্গি পরিত্যাগ করতে পারব না। কোশলরাজ পসেনদি থেকে শুরু করে অন্যান্য রাজারাও আমার দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে জানে। এখন যদি আমি সেটা পরিত্যাগ করি তাহলে তারা বলবে, এই পায়াসি রাজা মুর্খ ও অজ্ঞ।’
কুমারকাশ্যপ ভান্তে তখন তাকে অপণ্ণক জাতকের উপমা (প্রথম জাতক) দিয়ে বললেন, হে রাজা, আপনি মুর্খ ও অজ্ঞ হয়ে যেভাবে নয় সেভাবে পরলোকের অনুসন্ধান করে নিজেও বিনষ্ট হবেন। আপনাকে যারা বিশ্বাস করে, যারা আপনার কথা শোনে তাদেরকেও বিনষ্ট করাবেন। আপনি বরং এমন পাপমূলক দৃষ্টিভঙ্গি পরিত্যাগ করুন। এমন পাপমূলক দৃষ্টিভঙ্গি আপনার দীর্ঘকাল অকল্যাণ ও দুঃখের কারণ না হোক।
তখন রাজা আবারো বললেন, ‘মাননীয় কাশ্যপ, আপনি এমন বললেও আমি এমন দৃষ্টিভঙ্গি পরিত্যাগ করতে পারব না। কোশলরাজ পসেনদি থেকে শুরু করে অন্যান্য রাজারাও আমার দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে জানে। এখন যদি আমি সেটা পরিত্যাগ করি তাহলে তারা বলবে, এই পায়াসি রাজা মুর্খ ও অজ্ঞ।’
তা শুনে কুমারকাশ্যপ ভান্তে আরো কয়েকটা উপমার মাধ্যমে রাজাকে বুঝানোর চেষ্টা করলেন। রাজা তবুও তার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে অস্বীকার করলেন। অবশেষে কুমারকাশ্যপ ভান্তে একটা উপমায় বললেন, ‘হে রাজা, আরেকটা উপমা দিই। অতীতে দুজন বন্ধু এক জনপদের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। তারা সেই জনপদের কাছেই এক শূন্যগ্রামের নিকটে এসে দেখল বহু শণ ছড়িয়ে আছে। তখন তারা শণগুলো আঁটি বেঁধে দুজনে দুটো বড়সড় আঁটি নিয়ে আরেক শূন্যগ্রামে গিয়ে হাজির হলো। সেখানে দেখল বহু শণের সুতা ছড়িয়ে আছে।
তখন প্রথম বন্ধু বলল, “শণ হচ্ছে সুতার জন্য। অথচ এখানে প্রচুর শণের সুতা ছড়িয়ে আছে। তাহলে বন্ধু, তুমি তোমার শণের আঁটি ফেলে দাও। আমিও আমার শণের আঁটি ফেলে দেব। এখান থেকে শণের সুতা বাণ্ডিল করে নিয়ে যাব।”
কিন্তু দ্বিতীয় বন্ধুটি বলল, “বন্ধু, আমি এই শণের আঁটি অনেক দূর থেকে এনেছি। আমার জন্য এই শণের আঁটিই যথেষ্ট। তুমি যা ভালো বুঝ কর।” তা শুনে প্রথম বন্ধুটি আর কিছু বলল না। সে তার শণের আঁটি ফেলে দিয়ে শণের সুতার বাণ্ডিল নিয়ে রওনা দিল।
এরপর তারা আরেক শূন্যগ্রামে পৌঁছল। সেখানে তারা দেখল শণের সুতা দিয়ে তৈরি বহু বস্ত্র ছড়িয়ে আছে। তা দেখে প্রথম বন্ধুটি বলল, “বন্ধু, শণ বা শণের সুতা হচ্ছে বস্ত্র বানানোর জন্যে। অথচ এখানে প্রচুর শণবস্ত্র ছড়িয়ে আছে। তাহলে বন্ধু, তুমি তোমার শণের আঁটি ফেলে দাও। আমিও আমার শণের সুতার বাণ্ডিল ফেলে দেব। এখান থেকে শণবস্ত্রের বাণ্ডিল নিয়ে যাব।” কিন্তু দ্বিতীয় বন্ধুটি ঐ আগের মতোই তার শণের আঁটি ছাড়তে চাইল না। প্রথম বন্ধুটি শণবস্ত্র বাণ্ডিল করে রওনা দিল।
এভাবে তারা একের পর এক বিভিন্ন শূন্যগ্রামে বহু সুতিবস্ত্র, লোহা, সীসা ও সোনা ছড়িয়ে থাকতে দেখল। প্রথম বন্ধু আগেরগুলো ফেলে দিয়ে উৎকৃষ্ট জিনিস নিয়ে নিল। দ্বিতীয় বন্ধু কিন্তু তার শণের আঁটিটি ছাড়তে পারল না।
তারা এভাবে সেগুলো সংগ্রহ করে নিজ গ্রামে ফিরে গেল। শণের আঁটি নিয়ে ফিরে যাওয়া বন্ধুটিকে তার বাবা-মা অভিনন্দন জানাল না। স্ত্রী-পুত্ররাও অভিনন্দন জানাল না। বন্ধুবান্ধবরাও অভিনন্দন জানাল না। এতে সে সুখও পেল না।
অন্যদিকে সোনার বাণ্ডিল নিয়ে ফিরে যাওয়া বন্ধুটিকে তার বাবা-মা অভিনন্দন জানাল, স্ত্রী-পুত্ররা অভিনন্দন জানাল। বন্ধুবান্ধবরাও অভিনন্দন জানাল। এগুলোর মাধ্যমে সে সুখী হলো।
এভাবেই হে রাজা, আপনাকে সেই শণের আঁটি বহনকারী বলে মনে হচ্ছে। হে রাজা, এমন পাপমূলক দৃষ্টিভঙ্গি পরিত্যাগ করুন। এমন পাপমূলক দৃষ্টিভঙ্গি আপনার দীর্ঘকাল অকল্যাণ ও দুঃখের কারণ না হোক।’
অতএব যারা পরলোককে বিশ্বাস করে না, স্বর্গ নরক বিশ্বাস করে না, তারা সেই দৃষ্টিভঙ্গি ত্যাগ করুক এমন কামনা রইল।
[[উপসংহার: পায়াসি রাজা অবশেষে দান করা শুরু করেছিলেন। কিন্তু নিজ হাতে দান না দেয়ায় দানের ফল ভালোমতো পান নি। মরণের পরে তাই তার জন্ম হয়েছিল সবচেয়ে নিম্নতম চতুর্মহারাজিক স্বর্গে। অথচ তার কর্মচারী উত্তর নামের তরুণ যুবক নিজের হাতে সেই দানগুলো দিয়ে জন্মেছিল উচ্চতর তাবতিংস স্বর্গে। ]]

1 thought on “স্বর্গ নরকের অবিশ্বাসীদের জন্য পায়াসি সুত্রের সারসংক্ষেপ

  1. ভান্তে, বন্দনা।

    “কতঞ্ঞূতা কতবেদী (এ অচিন্তনীয় বিষয় পড়ে কেউ হাসপাতালে যেতে হলে আমার দোষ নাই)

    অন্য চক্রবালেও মানব জাতি আছে কি? ভদ্দন্ত পঞ্ঞাদীপ ভিক্খু। রাত ৯.৫৩মিঃ, ১০/৬/২০ইং।

    সূর্য, চন্দ্র, পৃথিবী, নক্ষত্র, তারা সমষ্টিকে ১ চক্রবাল বা চূললোকধাতু বলে। চূল লোকধাতু একসাথে উৎপন্ন-একসাথে স্থিতি-একসাথে ধ্বংস হয়। এরুপ উৎপন্ন-স্থিতি-ধ্বংস হওয়ার চক্রবাল সংখ্যা সর্বমোট ১ লক্ষ কোটি রয়েছে। সেই ১ লক্ষ কোটি চক্রবালকে ১ মহালোকধাতু বলে।

    ১ লক্ষ কোটি মহালোকধাতুকে পুন ১০ হাজার ভাগে ভাগ করা হয়। সেই ১০ হাজার ভাগ লোকধাতুকে মধ্যমলোকধাতু বলে।

    মধ্যমলোকধাতু চক্রবাল চূললোকধাতুকে ১০ হাজার লোকধাতু দিয়ে গঠন করে থাকে। সেই ১০ হাজার থেকে ১টি ঘূর্ণিপাক হলে বা কম্পন হলে সহজাত অন্য চক্রবাল ৯০৯ হাজার ৯ শত ৯০ কোটি চক্রবালও কম্পন হয়।

    চূললোকধাতু ১০ হাজারের সমান এক মধ্যমলোকধাতু। মধ্যমলোকধাতু ১০ কোটির সমান এক মহালোকধাতু গুলো একসাথে উৎপন্ন-একসাথে স্থিতি-একসাথে ধ্বংস হয়ে থাকে।

    বোধিসত্ব সুমেধ তাপস দীপঙ্কর বুদ্ধের পাদমূলে নিয়ত বর গ্রহণ করার পর বুদ্ধ হবার জন্য আমাকে কি করতে হবে? এ চিন্তা করলে- তখন তাঁর মনে ১০ পারমী পূরণ করতে হবে বলে জানতে পারে তখন এ চক্রবাল কম্পিত হয়েছিল।

    সেই সময় এ চক্রবালের সাথে সম্পৃক্ত অন্য ৯০৯ হাজার ৯ শত ৯০ কোটি চক্রবালও এক সাথে কম্পন হয়েছিল। সেটিকে এক মধ্যমলোকধাতু বলে।

    এ কারণটিকে বুদ্ধ নিজেই- “ইমে ধম্মে সম্মসতো, সভাবরস লক্খণে ধম্মতেজেন বসুধা, দস সহস্সী কম্পথ। চলতি রবতি পঠবী, উচ্ছুযন্তংব পীলিতং তেলযন্তং যথাচক্কং, মেদনী সম্পকম্পথ”- [বুদ্ধবংশ পালি]

    মহালোকধাতুর ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে মধ্যমলোকধাতু। মধ্যমলোকধাতুর ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে চূললোকধাতু। সেই চূললোকধাতুতে পূর্ব,পশ্চিম,উত্তর, দক্ষিণ চারদ্বীপ থাকে। সেই চারদ্বীপ থেকে মধ্যমদেশ থাকে। সেই মধ্যমদেশে বুদ্ধ উৎপন্ন হন। অন্য দ্বীপগুলোতে উৎপন্ন হন না। পচ্চেকবুদ্ধ ও চক্রবর্তী রাজা এ দক্ষিণদ্বীপে আবির্ভাব হন। অন্য দ্বীপে আবির্ভাব হয় না।

    অন্য চূললোকধাতুর দক্ষিণদ্বীপে বুদ্ধ, পচ্চেকবুদ্ধ, আর্য ভিক্ষু ও গৃহী থাকে না। কেবল চক্রবর্তী রাজা ও দেব ব্রহ্মাগণ উৎপন্ন হয়ে থাকে।

    পুনশ্চ মহালোকধাতু ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে মধ্যমলোকধাতু অবস্থিত। এ লোকধাতুর ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে চূললোকধাতু অবস্থিত। এ চূললোকধাতুতে থাকে চারদ্বীপ। চারদ্বীপের মধ্যে কেবল দক্ষিণদ্বীপ (জম্বুদ্বীপে) বুদ্ধ উৎপন্ন হন।

    মহালোকধাতুর মধ্যে সম্যকসম্বুদ্ধ উৎপন্ন চূললোকধাতু ছাড়া আরো ৯০৯ হাজার ৯ শত ৯০ কোটি চূললোকধাতু চক্রবালও রয়েছে।

    সেই চূললোকধাতুতে ৩১টি লোকধাতু (এক চক্রবাল) রয়েছে। সেই ৩১টি লোকধাতু গঠনের বৈশিষ্ট্য এ চক্রবালের সাথে একই রকম হয়ে থাকে। পার্থক্যটা হচ্ছে সেই ৯০৯ হাজার ৯ শত ৯০ কোটি চূললোকধাতু চক্রবালে মোটেই বুদ্ধ উৎপন্ন হন না। এটি ১ম পার্থক্য। ২য় পার্থক্য হলো এ চক্রবাল লোকধাতুর বাহিরে অন্য ৯০৯ হাজার ৯ শত ৯০ কোটি চূললোকধাতু গুলোতে মানুষ, আর্য ভিক্ষু, পচ্চেকবুদ্ধ উৎপন্ন হয় না। আর্য দেব ব্রহ্মা ও চক্রবর্তী রাজা অন্য চূললোকধাতু চক্রবালে উৎপন্ন হয়।

    আর্য দেব ব্রহ্মাগণ থাকলে আর্য মানব, আর্য ভিক্ষু পচ্চেকবুদ্ধ কেন থাকবে না? সম্যকসম্বুদ্ধ উৎপন্ন না হওয়ার কারণে তথায় আর্য মানব, আর্য ভিক্ষু থাকে না। যথারীতি বুদ্ধান্তর কল্পকালে পচ্চেকবুদ্ধ উৎপন্ন হয় তাই পচ্চেকবুদ্ধও থাকে না।

    আর্য দেব ব্রহ্মাগণ তথায় থাকে, সেই দেব ব্রহ্মাগণ তাদের ঋদ্ধিবল নিয়ে বুদ্ধ উৎপন্ন চক্রবালে ধর্মশ্রবন করার জন্য আসে এবং আর্য হন। দেব ব্রহ্মাগণ ধর্মশ্রবনের আগমন বিষয় পিটক গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে।

    অন্য চক্রবালে বুদ্ধ উৎপন্ন না হলেও তথায় চক্রবর্তী রাজা আবির্ভাব হয় তিনি ধর্ম সম্মত শাসন করেন। মানুষরা চক্রবর্তী রাজার ধর্মোপদেশ শ্রবন করে দান শীল সমথ আচরণ অনুশীলন করে স্বর্গ ব্রহ্মলোকে উৎপন্ন হয়ে ব্রহ্মালোক থেকে বুদ্ধের নিকট এসে ধর্মশ্রবন করে দুঃখমুক্তি হয়।

    উপরোক্ত বর্ণনা আলোকে অন্য লোকধাতু চক্রবালেও নিশ্চয় মানব জাতি রয়েছে বলে জানতে হবে।

    রত্নসুত্র খন্ধসুত্র মোর সুত্র ধজগ্র সুত্র আটানাটিয সুত্রগুলোতে বুদ্ধের আজ্ঞা চূললোকধাতু কোটিশত সহস্র চক্রবাল বিস্তৃতি হয়।

    উপরোক্ত মহালোকধাতুর মত আরো বহু মহালোকধাতুও রয়েছে। সে সমস্ত লোকধাতু গুলোকে অনন্তলোকধাতু বলে। একেকটি মহালোকধাতু সমূহের সম্যকসম্বুদ্ধগণ স্বীয় স্বীয় উৎপন্ন হয়ে থাকে।

    সবার হিত সুখ মঙ্গল হোক।”

    ভান্তে, সহজ ব্যাখ্যাটি কী?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *