আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

ধর্ম হচ্ছে অকালিক, কিন্তু …

ধর্মের ছয়টি গুণের মধ্যে একটি হচ্ছে অকালিক। অর্থাৎ ধর্ম হচ্ছে কাল-অকালবিহীন। কিন্তু এপর্যন্ত এর ব্যাখ্যা যে কতজনকে কতভাবে দিতে দেখলাম। আজকে একটু পিটকে খুঁজে দেখলাম কী লেখা আছে।

প্রথমেই আমরা বিশুদ্ধিমার্গের ৭নং অধ্যায়ের ধর্মানুস্মৃতিতে দেখি। সেখানে বলা হয়েছে, ধর্মের ছয়টি গুণের মধ্যে যে অকালিক গুণটি বলা হয়, সেটি লোকোত্তর মার্গকে উদ্দেশ্য করেই বলা হয়েছে। কালিক বলা হয় লৌকিয় কুশল কর্মগুলোকে। সেগুলোর ফলদানে কিছু সময় লাগে। কিন্তু অকালিক হচ্ছে লোকোত্তর মার্গগুলো। সেগুলোর ফল দিতে কোনো দেরি হয় না। মার্গলাভের পরপরই ফল লাভ হয়। অতএব বিশুদ্ধিমার্গমতে, অকালিকো শব্দটি লোকোত্তর মার্গের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, অন্যান্য কুশল কর্মের ক্ষেত্রে নয় (বিশুদ্ধিমার্গ.১.১৪৯)।

মধ্যম নিকায়ের সেল সুত্রে (ম.নি.২.৪০০) ধর্মের গুণাবলী সংযুক্ত একটি গাথায় বুদ্ধ সেল ব্রাহ্মণকে বলেছেন,
স্বাক্খাতং ব্রহ্মচরিযং, সন্দিট্ঠিকং অকালিকং। যত্থ অমোঘা পব্বজ্জা, অপ্পমত্তস্স সিক্খতো’’তি॥
অর্থাৎ, সুব্যাখ্যাত ব্রহ্মচর্য, স্বয়ং দর্শনীয়, অকালিক। যেখানে অপ্রমত্তভাবে ত্রিশিক্ষার মাধ্যমে (অর্থাৎ শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞা শিক্ষার মাধ্যমে) প্রব্রজ্যা সফল হয়।

সেল সুত্রের অর্থকথা বলছে, অকালিকন্তি মগ্গানন্তরফলুপ্পত্তিযা ন কালন্তরং পত্তব্বফলং। অর্থাৎ মার্গের পরপরই ফলের উৎপত্তি হওয়ায় সেখানে ফল পেতে সময় লাগে না বলে অকালিক। কাজেই এখানেও সেটা লোকোত্তর মার্গকে উদ্দেশ্য করেই বলা হয়েছে।

খুদ্দক নিকায়ের চূলনির্দেশ গ্রন্থে বলা হয়েছে, অকালিকন্তি যথা মনুস্সা কালিকং ধনং দত্বা অনন্তরা ন লভন্তি, কালং আগমেন্তি, নেৰাযং ধম্মো। যো দিট্ঠেৰ ধম্মে অরিযং অট্ঠঙ্গিকং মগ্গং ভাৰেতি, তস্স মগ্গস্স অনন্তরা সমনন্তরা অধিগচ্ছতেৰ ফলং ৰিন্দতি পটিলভতি, ন পরত্থ ন পরলোকে, এৰং অকালিকন্তি (চূল.নি.১১২)।

অর্থাৎ মানুষেরা যেমন কাউকে ধন দেয়ার পরপরই তা ফিরে পায় না, বরং সময় হলে তবেই ফিরে পায়, এই ধর্ম কিন্তু সেরকম নয়। যে ইহজীবনে আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ ভাবনা করে, সে সেই মার্গের পরপরই ফল লাভ করে। পরকালের অপেক্ষা করতে হয় না, পরলোকে যেতে হয় না। এভাবেই ধর্ম হচ্ছে অকালিক। দেখলেন তো, এখানেও ধর্মকে কিন্তু সেই লোকোত্তর মার্গকে উদ্দেশ্য করেই অকালিক বলা হয়েছে।

হয়তো প্রশ্ন জাগতে পারে, কীভাবে মার্গের পরপরই ফল উৎপন্ন হয়? এর জন্য আমরা বিশুদ্ধি মার্গের ২২ নং অধ্যায়ে স্রোতাপন্ন ব্যক্তির অনুচ্ছেদটা দেখতে পারি। আমরা জানি, আমাদের মনে মুহুর্তের মধ্যে অসংখ্য চিত্ত একটার পর একটা উৎপন্ন হয়ে বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু চিত্তগুলো যেমন খুশি উৎপন্ন হয় না। তাদের উৎপন্ন ঽওয়ার কিছু নিয়ম আছে যেগুলো অভিধর্মার্থ সংগ্রহের বীথি ও বীথিমুক্ত পরিচ্ছেদে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আমি সেগুলোতে যাব না। শুধু বিশুদ্ধিমার্গ অনুসারে এটুকু বলি, মার্গচিত্ত যে বীথিতে উৎপন্ন হয় সেখানে জবন চিত্তগুলোর মধ্যে প্রথমে দুটো বা তিনটা অনুলোম চিত্ত উৎপন্ন হয়, এরপর একটি গোত্রভু চিত্ত, একটি মার্গচিত্ত ও তিনটা বা দুটো ফলচিত্ত পরপর উৎপন্ন হয়। এরপর স্বাভাবিক নিয়মেই বহু ভবাঙ্গ চিত্ত উৎপন্ন হয়।

কাজেই আপনারা দেখছেন যে, মার্গ চিত্তের পরপরই তার ফল হিসেবে ফল চিত্ত উৎপন্ন হয়। সেখানে কোনো গ্যাপ থাকে না। কোনো সময় লাগে না। আমি কোথায় যেন পড়েছিলাম, পৃথিবী ধ্বংসের মুহুর্তেও যদি কোনো ব্যক্তির মার্গলাভ হয়, তাহলে তার ফল লাভ না করা পর্যন্ত পৃথিবী ধ্বংস হবে না। এমনই অমোঘ এই লোকোত্তর মার্গগুলো। অতএব বুঝতেই পারছেন, অকালিক হচ্ছে কেবল লোকোত্তর মার্গচিত্তগুলো। অন্যান্য চিত্তগুলোর ক্ষেত্রে কিন্তু সময় কিছুটা লাগেই।

যেমন ধরুন আপনি কাউকে কয়েক সেকেণ্ডের একটা গালি দিলেন। ধরা যাক সেই কয়েক সেকেণ্ডের মধ্যে আপনার মনে ১ লাখ কামাবচর চিত্তবীথি উৎপন্ন হয়ে গেল (অভিধর্মমতে, এক তুড়ি ক্ষণেই লক্ষ কোটি চিত্ত উৎপন্ন হয়ে বিলীন হয়ে যায়। তবে আমি এখানে উপমা হিসেবে ১ লাখ ধরলাম মাত্র)। প্রত্যেক কামাবচর চিত্তবীথিতে ৭টি জবন চিত্ত থাকে। সেই চিত্তগুলোই হচ্ছে কর্ম। তার মানে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ৭ লাখ অকুশল কর্ম করে ফেললেন আপনি। চিয়ার্স। এখন ৭ লাখের মধ্যে ৫ লাখ কর্ম আছে যেগুলো পরবর্তী জন্মগুলোতে যেখানেই সুযোগ পাবে ফল দেবে। তার ফল হিসেবে আপনিও সেরকম পরিস্থিতি হলে গালি শুনবেন। সে যাই হোক, সে তো ভবিষ্যতের কথা। কাজেই সেখানে কিছুটা সময় লাগে। অতএব সেটা অকালিক নয়।

৭ লাখের মধ্যে ৫ লাখ গেল। বাকি রইল ২ লাখ কর্ম। সেগুলো কখন ফল দেবে? সেই ২লাখের মধ্যে ১ লাখ কর্মের ফল আপনি পেতে পারেন পরবর্তী জন্মে। পরবর্তী জন্মে যদি ভাগ্যক্রমে গালাগালি না শোনেন তো ভাগ্য ভালো। তখন সেই ১ লাখ কর্ম নিষ্ফল হয়ে যাবে। সেগুলো আর ফল দিতে পারবে না। কিন্তু সেটার জন্য পরবর্তী জন্ম পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কাজেই সময় লাগবে। অতএব সেটাও অকালিক নয়।

বাকি ১লাখ অকুশল কর্মের ফল আপনি ইহজন্মেই পেতে পারেন। এর ফলস্বরূপ কিছু সময় পরে আপনিও হয়তো অপ্রিয় কোনো গালি শুনতে পারেন। কিন্তু ইহজন্মে ফল দিলেও সেটা মার্গচিত্তবীথির মতো একই চিত্তবীথিতে ঘটবে না। পরবর্তী কোনো এক চিত্তবীথিতে হয়তো দিলেও দিতে পারে। তাই আপনার গালির ফলে আপনাকে যে উল্টো গালি শুনতে হয় সেটা ইহজন্মের গালির ফলও হতে পারে, আবার অতীত জন্মের অকুশল ফলও হতে পারে। নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না। তবে ইহজন্মের হলেও কর্ম ও ফলের মধ্যে কিছুটা গ্যাপ থাকে, সময় লাগে। কাজেই এটাও অকালিক নয়।

কুশল কর্মগুলোর ব্যাপারেও ব্যাপারটা এমনই হয়। এভাবে কালিক ও অকালিক বিষয়টা একটু ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলাম। আশা করি কেউ না কেউ বুঝবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *