আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

বুদ্ধশাসনের ইতিহাস – ৪র্থ পর্ব – অভয়গিরি বিহারের উত্থান পতন

বট্টগামণি শ্রীলঙ্কার রাজা হওয়ার পরে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ মহাতিষ্য স্থবিরকে অভয়গিরি বিহার নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। তখন থেকে মহাবিহার ও অভয়গিরি বিহার দুটো আলাদা নিকায় হিসেবে অবস্থান করতে থাকে। অভয়গিরি বিহার ক্রমে ক্রমে মহাযান ও বজ্রযান শিক্ষার মূল কেন্দ্র হয়ে ওঠে। মহাবিহারের ভিক্ষুরা রক্ষণশীল মনোভাবের হওয়ায় তারা অভয়গিরিবাসীদেরকে অধর্মবাদী বলত। কিন্তু তবুও অভয়গিরি বিহারের প্রচার ও প্রসার বাড়তে থাকে। ক্রমান্বয়ে এটি সংস্কৃত ও পালির বিভিন্ন বিখ্যাত পণ্ডিতদের আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। এদের মধ্যে ছিলেন বিমুক্তিমার্গের লেখক উপতিষ্য, কবিচক্রবর্তী আনন্দ, আর্যদেব, আর্যসুর। আরো ছিলেন তান্ত্রিক আচার্য জয়ভদ্র ও চন্দ্রমালি। চীনে বজ্রযানের প্রচারক দুই ভারতীয় ভিক্ষু বজ্রবোধি এবং অমোঘবজ্র ৮ম শতাব্দীতে সেখানে গমন করেছিলেন।

সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে অভয়গিরি খুবই বিখ্যাত ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। চীন, জাভা ও কাশ্মীরের সাথে এর খুব দৃঢ় সংযোগ গড়ে উঠেছিল। চাইনিজ গ্রন্থগুলো থেকে জানা যায়, ৪২৬ খ্রিস্টাব্দে আটজন শ্রীলঙ্কান ভিক্ষুণী একটা জাহাজে করে চীনের নানজিং শহরে পৌঁছান। পরবর্তীতে আরো তিনজন শ্রীলঙ্কান ভিক্ষুণী তাদের সাথে যোগ দেন। এভাবে ৪৩৪ সালে ৩০০০ এরও অধিক ভিক্ষুণী চীনে উপসম্পদা গ্রহণ করে।

ফাহিয়েন নামক একজন চীনা ভিক্ষু ৪০৬ সালে শ্রীলঙ্কায় এসেছিলেন। তার বর্ণনায় জানা যায়, তখন মহাবিহারে থাকত ৩০০০ ভিক্ষু। অন্যদিকে অভয়গিরিতে থাকত ৫০০০ ভিক্ষু। তিনি এমনকি মহাবিহারের এক শ্রামণের দাহক্রিয়া অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন। সেই শ্রামণটি নাকি অর্হৎ ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। তিনি অভয়গিরি বিহারে কয়েক বছর শিক্ষা করে সেখান থেকে সংস্কৃত ভাষায় অনূদিত মহাসাঙ্ঘিকদের বিনয়পিটক, দীর্ঘ আগম, সংযুক্ত আগম ও সম্মিলিত পিটকগুলো চীনে নিয়ে গিয়েছিলেন। এভাবেই চীনে মহাসাঙ্ঘিক ও মহাযানীদের গ্রন্থগুলো প্রসার ও বিস্তৃতি লাভ করে।

আরেক চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং ৭ম শতাব্দীতে এসে দুটো বিহারের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি অভয়গিরিবাসীদেরকে মহাযানী এবং মহাবিহারবাসীদেরকে হীনযানী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি আরো লিখেছেন, মহাবিহারবাসীরা মহাযানকে প্রত্যাখ্যান করে এবং কেবল হীনযান চর্চা করে। অন্যদিকে অভয়গিরিবাসীরা হীনযান ও মহাযান উভয়ই শিক্ষা করে।

এভাবে অন্তত দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার রাজাগণ অভয়গিরিবাসীদেরকেই সমর্থন ও সহায়তা দিয়ে এসেছিলেন। একারণেই ফাহিয়েন যখন পঞ্চম শতাব্দীতে শ্রীলঙ্কায় এসেছিলেন তখন তিনি অভয়গিরিবাসীদেরকেই মূলধারার বৌদ্ধধর্ম বলে দেখেছিলেন। তবে রাজা পরাক্রমবাহু যখন ১১৫৩ সালে রাজা হন, তিনি দেখলেন যে ভিক্ষুসঙ্ঘের বেশির ভাগই বিয়ে করছে। তাদের ছেলেমেয়ে হচ্ছে, গৃহীদের মতোই তারাও বিভিন্ন লাভজনক কাজের সাথে জড়িয়ে পড়ছে।

তখন কাশ্যপ মহাথেরো ছিলেন ত্রিপিটকধর এবং ভিক্ষুদের বিনয়নীতির ব্যাপারে খুবই সুপণ্ডিত। রাজা তার সাথে আলোচনা করে ভিক্ষুসঙ্ঘের মধ্যে সংস্কার করার উদ্যোগ নিলেন। তার উদ্যোগের প্রবল বিরোধিতা করল অভয়গিরিবাসী ভিক্ষুরা। অথচ রাজা দেখলেন তারাই বেশি দুঃশীল আচরণে ডুবে গেছে। তাদেরকে দুটো অপশন দেয়া হলো। হয় চীবর ত্যাগ করবে, না হয় মহাবিহারে আবার শ্রামণ হয়ে যাবে। তখন অভয়গিরি থেকে বহু ভিক্ষু বিদেশে পালিয়ে গেল। অন্যরা চীবর ত্যাগ করে গৃহী হয়ে গেল। এভাবে অবশেষে অভয়গিরি নিকায় একদম বিলুপ্ত হয়ে গেল। কিন্তু মহাযান, তন্ত্রযান ও বজ্রযানের যে শিক্ষাগুলো প্রায় ১০০০ বছর ধরে এরা প্রচার করে এসেছিল সেগুলো সহজে বিলুপ্ত হয় নি, অদূর ভবিষ্যতেও হবে বলে মনে হয় না।

বুদ্ধশাসনের ইতিহাস-১ম পর্ব – ভারতে বৌদ্ধধর্ম

বুদ্ধশাসনের ইতিহাস – ২য় পর্ব – শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধধর্ম

বুদ্ধশাসনের ইতিহাস – ৩য় পর্ব – অধর্মবাদীদের উৎপত্তি

বুদ্ধশাসনের ইতিহাস – ৪র্থ পর্ব – অভয়গিরি বিহারের উত্থান পতন

রেফারেন্স:
১. বিশুদ্ধিমার্গ নিদান কথা
২. কথাবত্থু অর্থকথা
৩. উইকিপিডিয়া

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *