আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

বুদ্ধশাসনের ইতিহাস – ২য় পর্ব – শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধধর্ম

মহিন্দ স্থবির শ্রীলঙ্কায় আসেন দেবানং প্রিয়তিষ্য রাজার আমলে, খ্রিষ্টপূর্ব ২৫৫ অব্দে। এরপরে সেখানে অনুরাধাপুর মহাবিহার প্রতিষ্ঠা করেন। থেরবাদীদের মূল কেন্দ্র ছিল এই মহাবিহার। তখন থেকে শ্রীলঙ্কায় থেরবাদী বুদ্ধশাসন কোনো বিরুদ্ধ নিকায়ের মতবাদ শূন্য হয়ে, নির্মল ও সুপরিশুদ্ধ হয়ে জ্বলজ্বল করছিল বট্টগামণি রাজার আগ পর্যন্ত।

বট্টগামণি রাজা খ্রিষ্টপূর্ব ১০৩ সালে রাজা হন। কিন্তু এর পাঁচ মাস পরেই সাতজন তামিল যোদ্ধার হাতে পরাজিত হয়ে পালিয়ে যান। তামিল যোদ্ধারা পর্যায়ক্রমে শ্রীলঙ্কা শাসন করতে থাকে। কিন্তু তাদের দুঃশাসনে তখন সেখানে এক অরাজকতা দেখা দেয়। চোরডাকাতের উপদ্রব ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। ভিক্ষুদের ভিক্ষান্ন ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় চীবর ইত্যাদি পর্যন্ত ঠিকমতো মেলে না। এমন অবস্থায় বেশিরভাগ ভিক্ষু তখন ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিল। কিন্তু শ্রীলঙ্কায় কয়েকজন ভিক্ষু জীবন বাজি রেখে রয়ে গেল। তারা নাকি তখন লতাপাতা যা পাওয়া যায় তাই খেয়ে জীবন ধারণ করত। তারা দেহে একটু বল থাকলে বসে বসে ত্রিপিটক আবৃত্তি করত, যাতে ভুলে না যায়। বসে থাকতে কষ্ট হলে তখন বালির স্তুপের চারদিকে মাথাগুলো একত্র করে শুয়ে পড়ে ত্রিপিটক আবৃত্তি করত। এভাবে তারা দীর্ঘ ১২ বছর যাবত অর্থকথাসহ ত্রিপিটককে ভুলে যেতে না দিয়ে ধারণ করে রেখেছিল।

বট্টগামণি রাজা ১২ বছর পরে সৈন্য সংগঠিত করে তামিল রাজাদের হত্যা করে আবার রাজ্য দখল করে নিলেন। তখন পরিস্থিতি অনুকুল হওয়াতে ভারতে পালিয়ে যাওয়া ভিক্ষুরা আবার ফিরে এলো শ্রীলঙ্কায়। তারা ফিরে এসে শ্রীলঙ্কায় রয়ে যাওয়া ভিক্ষুদের সাথে মিলিয়ে দেখল যে ত্রিপিটকের একটি অক্ষরও এদিক ওদিক হয় নি। এভাবে দুর্ভিক্ষ ও রাষ্ট্রীয় গোলযোগের মধ্যেও প্রাচীন স্থবিরগণ ধর্মবিনয়কে আগলে রেখেছিলেন পরম মমতায়।

কিন্তু এরপরেই ঘটলো ঝামেলা। বট্টগামণি রাজাকে বিপদে আশ্রয় দিয়েছিল মহাতিষ্য স্থবির। তার প্রতিদান হিসেবে রাজা এবার তার জন্য অভয়গিরি বিহার বানিয়ে দিলেন। কিন্তু সেই স্থবির বেশিমাত্রায় রাজার সংস্রবে থাকায় মহাবিহারবাসীরা তাকে নির্বাসন দিল। স্থবির মহাবিহার থেকে নির্বাসিত হয়ে অভয়গিরিতে চলে গেলেন। কিন্তু তার কয়েকজন শিষ্য তাদের গুরুর এমন হেনস্থাকে মেনে নিতে পারল না। তারা এর প্রতিবাদ জানালো। মহাবিহারবাসীগণ তখন তাদেরকেও সাময়িক বহিষ্কার করে দিলেন। বহিষ্কৃত ভিক্ষুরা রেগেমেগে মহাবিহার ত্যাগ করে অভয়গিরি বিহারে গিয়ে যোগ দিল। তারা আর মহাবিহারে ফিরে আসে নি। তখন থেকে শ্রীলঙ্কায় মহাবিহারবাসী ও অভয়গিরিবাসী এই দুই নিকায়ের জন্ম হলো।

বট্টগামণি রাজা তখন দেখে শুনে অভয়গিরিবাসী ভিক্ষুদেরকেই সমর্থন দিলেন, তাদের দিকেই ঝুঁকে পড়লেন। ফলে তার অনুসরণে তার মন্ত্রী ও অন্যান্য অভিজাত শ্রেণির লোকজনও অভয়গিরিতে অনেক বিহার, কুটির নির্মাণ করে দিল। এভাবে অভয়গিরিবাসী ভিক্ষুরা বহু অভিজাত লোকজনের কাছে পূজনীয় ও বরণীয় হলো।

এদিকে ভারত থেকে তখন বহিষ্কৃত মহাসাঙ্ঘিকদের অন্তর্গত ধর্মরুচি নিকায়ের ভিক্ষুরা তাদের রচিত ও অনুমোদিত ধর্মবিনয় নিয়ে আসল শ্রীলঙ্কায়। অভয়গিরিবাসী সিনিয়র স্থবিররা সেই ধর্মবিনয়কে সমর্থন দিল। এভাবে অভয়গিরি নিকায়ে ভিন্ন মতাবলম্বীরা ঠাঁই পেয়ে গেল। তারা তখন ত্রিপিটকের পাশাপাশি মহাসাঙ্ঘিকদের অন্তর্গত অন্যান্য নিকায়ের মতবাদগুলো এবং মহাযানী পিটককেও গ্রহণ করল।

************************************************************
* চতুর্থ সঙ্গীতি ও ত্রিপিটককে পুস্তক আকারে রূপ দান *
************************************************************
মহাবিহারবাসী স্থবিরগণ দেখলেন বুদ্ধবাণী ধরে রাখার জন্য বর্তমান অবস্থা খুব একটা অনুকুল নয়। পরবর্তী প্রজন্মের ভিক্ষুদের মধ্যেও দিন দিন স্মৃতি ও প্রজ্ঞার অবনতি হচ্ছে। তাই তারা এতকাল যাবত কেবল মৌখিক আবৃত্তির মাধ্যমে ধারণ করে রাখা ত্রিপিটক ও অর্থকথাকে এবারে পুস্তকে রূপ দিতে আরম্ভ করলেন।

তারা এর জন্য বেছে নিলেন শ্রীলঙ্কার তৎকালীন রাজধানী অনুরাধাপুর থেকে ৬৮ মাইল দূরের মলয় জনপদকে। সেখানকার মাতুল নগরের আলোক গুহায় মহাবিহারের মহারক্ষিত থেরো ও পাঁচশত ভিক্ষু মিলে ত্রিপিটক ও অর্থকথাসহ আবৃত্তি করলেন এবং সেগুলো তালপাতায় লিখে রাখলেন। স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তি তাদেরকে সবদিক দিয়ে সহযোগিতা করল। এভাবে প্রথম শতকে রাজা ও মন্ত্রীদের সহযোগিতা ছাড়াই শুধুমাত্র ভিক্ষুরা সঙ্গীতি ও ত্রিপিটক লেখার কাজটা সুসম্পন্ন করল। এবার থেকে ভিন্ন মতবাদীরা যদি বলে, অমুক সুত্রে বুদ্ধ এরূপ এরূপ বলেছেন, তখন সেটা পিটকের সাথে মিলিয়ে দেখে যাচাই করা সহজ হবে।

বুদ্ধশাসনের ইতিহাস-১ম পর্ব – ভারতে বৌদ্ধধর্ম

বুদ্ধশাসনের ইতিহাস – ২য় পর্ব – শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধধর্ম

বুদ্ধশাসনের ইতিহাস – ৩য় পর্ব – অধর্মবাদীদের উৎপত্তি

বুদ্ধশাসনের ইতিহাস – ৪র্থ পর্ব – অভয়গিরি বিহারের উত্থান পতন

রেফারেন্স:
১. বিশুদ্ধিমার্গ নিদান কথা
২. কথাবত্থু অর্থকথা
৩. উইকিপিডিয়া

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *