আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

জীবনে সুখ নয়, সন্তুষ্টিই হচ্ছে আসল

ফেসবুকে অনেকের পোস্টে দেখি, জীবনে কেন জানি সুখ নেই, সুখ নেই ভাব। জীবন কেউ সুখে কাটায়, কেউ দুঃখে কাটায়। ক্লেশ বেশি হলে চাওয়া-পাওয়াও বেড়ে যায়, সাথে পাল্লা দিয়ে দুঃখগুলো বাড়ে। জীবন তখন দুঃখময় হয়। ক্লেশ কম হলে অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকা যায়। সুখময় হয় জীবন। সেটা হোক গৃহী জীবন, হোক প্রব্রজ্যা জীবন।

বুদ্ধের সময়ে সপ্পদাস নামে এক ভিক্ষু ছিল। সে ২৫ বছর ধরে প্রব্রজ্যা জীবন কাটিয়েছিল। কিন্তু তার মনের কলুষতা ছিল খুব বেশি। যার কারণে এত বছর প্রব্রজ্যাজীবন কাটিয়েও এক মুহুর্ত পর্যন্ত মনকে শান্ত করতে পারে নি। কামবাসনা সবসময় তার মন জুড়ে থাকত।

মনে অশান্তি নিয়ে তাই সে একদিন ভাবল, “এমন নির্বাণদায়ী বুদ্ধশাসনে প্রব্রজ্যা নিলাম, অথচ ক্লেশের কাদা থেকে এখনো নিজেকে উদ্ধার করতে পারলাম না।” মনের দুঃখে সে আকুল হয়ে কেঁদে কেঁদে বিহার থেকে বের হলো। উদ্দেশ্য ছিল একটাই। হয় গাছ থেকে লাফ দিয়ে মরবে, অথবা ফাঁসিতে ঝুলে মরবে, অথবা অন্য যেকোনো উপায়ে মরবে। কেউ কেউ বলে, প্রব্রজ্যা নিয়ে থাকতে না পারলে গৃহী হয়ে যাওয়া ভালো। কিন্তু বুদ্ধ বলেছেন, প্রব্রজ্যা ত্যাগ করাটা হচ্ছে মরে যাওয়ার সামিল (ম.নি.৩.১.৫)। তাহলে কীভাবে সে ভিক্ষুত্ব জীবন ত্যাগ করে গৃহী হবে? তার চেয়ে আত্মহত্যা করাটাই ভালো। এভাবে বেঁচে থাকার কোনো মানে হয় না।

কিন্তু বাইরে এভাবে আত্মহত্যা করার অনেক ঝামেলা। সেটা করতে গিয়ে হয়তো মরার আগেই লোকজন দেখে ফেলতে পারে। তার চেয়ে ঘরের ভেতরে আত্মহত্যা করাই ভালো হবে। এই ভেবে সে নিজের রুমে গিয়ে ক্ষুর হাতে নিয়ে বিছানায় বসল। কিন্তু নিজের গলায় ক্ষুর বসিয়ে দেয়ার আগে তার চিন্তা জাগল, “আমার শীল বিশুদ্ধ আছে তো?” সে বিচার করে দেখল, তার একদম অখণ্ড সুপরিশুদ্ধ শীলই পরিপূর্ণ আছে। সেটা দেখে তার মনে খুশিভাব জাগল। খুশিতে দেহে শান্তি আসল। প্রশান্ত দেহে সুখী চিত্ত এবার একাগ্র হলো ধ্যানে। একাগ্র মনে বিদর্শনের মাধ্যমে অনিত্যতাকে উপলদ্ধি করে সে অর্হৎ হলো। অর্হৎ হওয়ার পরে তার আর আত্মহত্যার মানসিকতা রইল না। সে এবার নির্লিপ্ত মনে তার শেষজীবন কাটিয়ে দিল। আর হাহুতাশ করল না।

অতএব, ক্লেশের কারণে মনে হয়তো অশান্তি আসবে, দুঃখ জাগবে, হতাশা জাগবে। কিন্তু তাই বলে নিজের পুণ্যকর্মগুলো ভুলে যাওয়া ঠিক নয়, শীল বিসর্জন দেয়া ঠিক নয়, ধ্যানচর্চা বিসর্জন দেয়া ঠিক নয়। সংকটের মুহুর্তে সেগুলোই হচ্ছে অগতির গতি, অসহায়ের সহায়। সংকটের মুহুর্তে আরো বেশি পুণ্যকর্ম করুন, আরো দৃঢ়ভাবে শীল অধিষ্ঠান করুন, আরো বেশি বেশি ধ্যানচর্চা করুন। সবকিছুকে অনিত্য হিসেবে উপলদ্ধি করুন, দুঃখময় হিসেবে উপলদ্ধি করুন, অনাত্ম হিসেবে উপলদ্ধি করুন। এই দেহে কোনো সত্ত্ব নেই, জীব নেই, আত্মা নেই। এটা স্রেফ মনোদৈহিক প্রক্রিয়াগুলোর ক্রমাগত ধারাবাহিকতা মাত্র। অন্যকিছু নয়। এভাবে বুদ্ধের মূল শিক্ষাকে সবাই ধারণ করুন, চর্চা করুন। তাহলে এটা নিশ্চিত থাকতে পারেন, ইহজীবনে বা পরে কোনো এক জন্মে এই দুঃখ থেকে মুক্ত হওয়া যাবেই। সবাই সুখী হোন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *