আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

আত্মহত্যা মহাপাপ নয়, বরং পাপের ফলেই আত্মহত্যা হয়

সারা দুনিয়ার মানুষ জানে আত্মহত্যা মহাপাপ। মনে হয় সবধর্মেই আত্মহত্যার বিরুদ্ধে বলা হয়েছে। বৌদ্ধধর্ম এব্যাপারে কী বলে? বুদ্ধও কি বলেছিলেন আত্মহত্যা মহাপাপ? বনভান্তের কয়েকজন শিষ্য আত্মহত্যা করেছে, সেটা আমি ভালোই জানি। সেটা নিয়েও নিন্দুকদের মাতামাতির শেষ নেই। সত্যমিথ্যা জানার জন্য তাই আসুন দেখি আত্মহত্যার ব্যাপারে ত্রিপিটকে কীরকম বলা হয়েছে।

মধ্যম নিকায়ের ছন্নোৰাদ সুত্রে ছন্ন নামের এক ভিক্ষুর আত্মহত্যার কাহিনী আছে। এই ছন্ন বুদ্ধের সারথি ছন্ন নয়, অন্য এক ভিক্ষু। সে কী যেন এক মরণব্যাধিতে আক্রান্ত ছিল। সারিপুত্র ও মহাচুন্দ তখন তাকে দেখতে গেলেন। তারা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “বন্ধু ছন্ন, বেশি কষ্ট হচ্ছে না তো?”

ছন্ন তাদেরকে বলল, “বন্ধু সারিপুত্র, খুব কষ্ট হচ্ছে। মাথাটা যেন ধারালো ছুরি দিয়ে কোপাচ্ছে কেউ। যেন কেউ তীক্ষ্ণ শলাকা বসিয়ে দিয়েছে মাথার চারদিকে, এমন মাথার যন্ত্রণা হচ্ছে। যেন কোনো কসাই তার ধারালো অস্ত্র দিয়ে পেট চিরে দিচ্ছে, পেটে এমন ব্যথা। যেন কেউ আমাকে ধরে আগুনে সেঁকছে, সারা গায়ে এমন জ্বালাযন্ত্রণা। বন্ধু সারিপুত্র, আমি ছুরি দিয়ে আত্মহত্যা করব। আর বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করছে না।”

সারিপুত্র ভান্তে তখন বললেন, “বন্ধু, আত্মহত্যা করবেন না। আপনি বেঁচে থাকুন। আপনার যদি উপযুক্ত খাদ্য না পান, তাহলে আমি আপনার জন্য উপযুক্ত খাদ্য খুঁজে দেব। আপনার যদি ওষুধ না থাকে, তাহলে আমি আপনার ওষুধ খুঁজে দেব। আপনার যদি সেবক না থাকে, তাহলে আমিই আপনাকে সেবা করব। আপনি আত্মহত্যা করবেন না। আপনি বেঁচে থাকুন, এটাই আমরা চাই।”

তবুও তারা চলে আসার পরে ছন্ন ভিক্ষুটি ছুরি দিয়ে নিজের কণ্ঠনালি কেটে ফেলল। সেই মুহুর্তে তার মনে মরণভয় উৎপন্ন হলো। গতিনিমিত্ত এসে উপস্থিত হলো। এতে সে বুঝতে পারল যে সে এখনো অর্হৎ নয়। তখন সে দ্রুত বিদর্শনে মন দিয়ে সংস্কারগুলোর অনিত্যতাকে গ্রহণ করে অর্হৎ হলো এবং সাথে সাথে মারা গেল।

এদিকে সারিপুত্র ও মহাচুন্দ গিয়ে ভগবান বুদ্ধকে ব্যাপারটা জানালেন। বুদ্ধ কিন্তু আত্মহত্যার ব্যাপারে কোনো উচ্চবাচ্য করলেন না। বুদ্ধগণ মরণের প্রশংসা করেন না। আবার নিন্দাও করেন না। তারা জানেন, কর্মফল হচ্ছে অলঙ্ঘনীয়। তাই তাদের কথা শুনে বুদ্ধ তখন বললেন, “ছন্ন ভিক্ষু পুনর্জন্মরহিত হয়েই ছুরি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।”

সংযুক্ত নিকায়ের সগাথাবর্গে মারসংযুক্তে গোধিকসুত্র নামে একটি সুত্র আছে। সেখানে বলা হয়েছে, গোধিক ভিক্ষু নাকি প্রথমবার ধ্যানসমাধি পেয়ে পরে আবার তা হারিয়ে ফেলেছিল। দ্বিতীয়বার সে আবার ধ্যান লাভ করল। কিন্তু পরে সেটাও হারিয়ে ফেলল। এভাবে ছয়বার ধ্যান লাভ করল, ছয়বারই আবার হারিয়ে ফেলল। তার নাকি রোগের কারণে এরকম হতো। কখনো বায়ুর প্রকোপ হতো, কখনো পিত্তের প্রকোপ হতো, কখনো শ্লেষ্মার প্রকোপ হতো। কখনো সবগুলো একত্রে খারাপ হয়ে যেত। সেই সাথে ধ্যানের উপযুক্ত আবহাওয়া এবং খাদ্যও মিলত না। তাই সে এতবার ধ্যানলাভ করেও তা ধরে রাখতে পারে নি।

এরপর সে সপ্তমবারের মতো ধ্যান লাভ করে চিন্তা করল, “ছয়বার ধ্যানলাভ করেও হারিয়ে ফেলেছি। ধ্যান হারিয়ে মারা গেলে মরার পরে কোথায় জন্মাব ঠিক নেই। ধ্যানসহকারে মরলে তখন তো নিশ্চিত ব্রহ্মলোকে জন্মানো যাবে। তাহলে বরং ছুরি দিয়ে আত্মহত্যা করি না কেন?” সে তখন শুয়ে পড়ে ছুরি দিয়ে নিজের গলা কেটে ফেলল। এতে প্রচণ্ড দুঃখবেদনা উৎপন্ন হলো। সে তখন সেই বেদনাকে সহ্য করে সেই বেদনাকে নিয়েই ভাবনা করে অর্হৎ হয়ে সাথে সাথে মারা গেল।

এদিকে মার তখন গোধিক ভিক্ষুর মনের খবর জেনে নিমেষেই বুদ্ধের কাছে হাজির হয়ে গাথা সহকারে বলল,
“হে মহাবীর, আপনার শিষ্য মরণের আকাঙ্খা করছে।
হে জ্যোতিষ্মান, আপনি তাকে নিষেধ করুন।
হে ভগবান, আপনার শাসনে রত শিষ্য
অর্হৎ না হয়ে মারা গেছে বলে লোকজন জানবে সেটা কি ভালো হবে?”

মারের কথাগুলো কি সুন্দর তাই না? আজকালকার নিন্দুকেরা এবং অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিরাও তো সেটাই বলবে। অথচ বুদ্ধ তার উত্তরে বললেন,
“জ্ঞানীরা এমনই করে থাকে। তারা জীবনের আকাঙ্খা করে না। তৃষ্ণাকে শেকড়সুদ্ধ উপড়ে ফেলে গোধিক ভিক্ষু পরিনির্বাপিত হয়েছে।”

বুদ্ধ তো এখানেও আত্মহত্যার বিরুদ্ধে কিছু বললেন না। বক্কলি স্থবিরও আত্মহত্যা করেছিলেন এভাবে। সেখানেও বুদ্ধ নিরব।

আগের পোস্টেও উল্লেখ করেছি, বুদ্ধ একসময় ভিক্ষুদেরকে অশুভ ভাবনা করতে বলেছিলেন। সেই ভিক্ষুদের মধ্যে ৫০০ জন ভিক্ষু ছিল যাদের অশুভ ভাবনা করার পরে দেহের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মেছিল। তখন সেই ৫০০ জনের মধ্যে যারা মার্গফল লাভ করে নি তারা কেউ কেউ দেহের প্রতি বিতৃষ্ণার কারণে ছুরি দিয়ে আত্মহত্যা করতে লাগল। তখন এমনও হতো যে একদিনে দশজন, বিশজন, ত্রিশজন পর্যন্ত সেরকম সাধারণ ভিক্ষু আত্মহত্যা করত। কেউ কেউ অন্যজনকে দিয়ে আত্মহত্যা করাতো। বুদ্ধ কিন্তু জানতেন যে তারা এভাবে আত্মহত্যা করবে।

তারা নাকি অতীতজন্মে ৫০০ জনের একটা দল হয়ে সারা বন ঘিরে হরিণ, পশু পাখি যা পেত সেগুলো হত্যা করে জীবন চালাত। তারা সারা জীবন সেভাবে সেই শিকারের পেশায় কাটিয়ে মরণের পর নরকে জন্মেছিল। এরপর কোনো এক পুণ্যকর্মের ফলে এই বুদ্ধের আমলে জন্ম নিয়েছিল। কুশল কর্মের সহায়তায় তারা বুদ্ধের কাছে প্রব্রজ্যা ও উপসম্পদা লাভ করতে পেরেছিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ অর্হৎ হয়েছিল, কেউ কেউ মার্গফল পেয়েছিল। মার্গফল লাভ করলে তারা আর দুর্গতিতে যায় না। কিন্তু বাকিরা ছিল সাধারণ ভিক্ষু মাত্র। বুদ্ধ জানতেন, যদি তারা ভাবনা না করে, তাহলে তাদের গতি অনিশ্চিত। তার চেয়ে বরং অশুভ ভাবনা দিলেই ভালো হবে। ভাবনা করলে তখন তারা অন্তত আত্মহত্যা করলেও স্বর্গে যেতে পারবে। সেটা জেনেই তিনি অশুভ ভাবনা দেশনা করেছিলেন।

বুদ্ধগণ মৃত্যুর প্রশংসা করেন না, সেটা সে আত্মহত্যা হোক বা স্বাভাবিক মৃত্যু হোক। আবার নিষেধও করেন না। কর্মফলে থাকলে মৃত্যু হয়ই। কর্মফল পরিপক্ক অবস্থায় কোনো কারণে যদি না মরে, তাহলে আত্মহত্যা করে মরে। কে কীভাবে মরবে সেটা যার যার কর্মফলের ব্যাপার। এব্যাপারে আরেকজনকে বা আরেক পক্ষকে দোষারোপ করাটা অর্থহীন।

তাই বলে কেউ আত্মহত্যা করবে বললে আমরা চেয়ে চেয়ে দেখব সেটাও হতে দেয়া উচিত নয়। এক্ষেত্রে সারিপুত্র ভান্তের মতোই আমাদেরও তাকে যথাসাধ্য বুঝানো উচিত। তারপরও যদি সে এমন আত্মহত্যা করে তাহলে তাতে আমাদের আর কিছু করার থাকে না।

তাই “আত্মহত্যা মহাপাপ” না বলে বলা উচিত, “পাপের ফলেই আত্মহত্যা হয়।” তবেই সেটা বৌদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *