আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

বীভৎস অবস্থায় মরলে প্রেত হয়?

বনভান্তের স্কয়ার হাসপাতালে মৃত্যুকালীন ছবি নিয়ে নিন্দুকেরা অনেক গুজব রটাচ্ছে। বনভান্তে নাকি মরে প্রেত হয়েছে। নাহলে মৃত্যুকালীন এমন বীভৎস ছবি কেন? কেউ কেউ তো ভুতের ছবির সাথে তুলনা করে ফেসবুকে কত পোস্ট দিল। যাই হোক যার কর্মের ফল সে ভোগ করবে। এতে আমার বলার কিছু নেই। তবে আমার প্রশ্ন হচ্ছে, তাদের ছবিতে বনভান্তের মুখটা এমন হা কেন?

আমি ছবিটা একটু খুঁটিয়ে দেখলাম। খেয়াল করলাম বেশ বড়সড় একটা নল ভান্তের মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। সেটা অক্সিজেনের নল না কীসের নল বুঝলাম না। মূলত সেটার কারণেই বনভান্তের মুখটা এমন হা করে আছে।

এরপরে কয়েকটা ছবিতে দেখলাম নল নেই। তবুও মুখটা হা হয়ে আছে। সাধারণত মারা যাওয়ার চার ঘন্টা পরে মৃতদেহের মাংসপেশিগুলো শক্ত হয়ে যায়। মৃতদেহ এই অবস্থায় সাধারণত দশ/বারো ঘন্টা থেকে শুরু করে কয়েকদিন পর্যন্ত থাকতে পারে। সেটাকে বলা হয় রিগর মর্টিস। বনভান্তের মৃতদেহও তখন মনে হয় রিগর মর্টিসের অবস্থায় ছিল। যার ফলে খোলা মুখটা আর বন্ধ করা যায় নি।

এ তো গেল বনভান্তের মৃতদেহের এমন ছবির পিছনের মূল কারণ। এবার আসি মূল প্রশ্নে- এমন বীভৎস অবস্থায় মরলে কি সত্যিই প্রেত হয়?

বিষয়টা ভাবার মতোই বটে। যেমন ত্রিপিটকে আমরা জানি, চুন্দ নামের এক শুকর পালনকারীর কাহিনী। সে নাকি একসপ্তাহকাল ধরে শুয়োরের মতো আর্তনাদ করে মরার পরে নরকে গিয়েছিল। বড়ই করুণ মৃত্যু, সন্দেহ নেই। আবার সেই গরুর কসাইয়ের কথা ধরুন না। সে নাকি জ্যান্ত গরুর মুখ থেকে জিহ্বাটা কেটে নিয়ে রান্না করে খাওয়া শুরু করেছিল। কিন্তু এক গ্রাস মুখে দিতেই তার জিহ্বাটাও ভাতের থালায় খসে পড়ল। যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে সে মারা গেল। এমন বীভৎস মৃত্যু কল্পনা করাও কঠিন। এমন আরো অনেক ঘটনা আছে যেগুলোতে খুব ভয়ানক মৃত্যু হয়েছে, এবং পাপীদের স্থান হয়েছে নরকে। এ থেকে আমাদের সাধারণ ধারণা হয়, বীভৎস মৃত্যু হলেই তাদের স্থান হয় নরকে, নয় প্রেতকুলে।

তাহলে ধর্মপদ অর্থকথায় শ্যামাবতী ও তার সহচরীরা যখন জ্যান্ত পুড়ে মরল, তখন তারা কোথায় গেল? নরকে গেল? নাকি প্রেতকুলে গেল? জ্যান্ত পুড়ে মরাটা কতটা বীভৎস হতে পারে তা গুগলে ‘burnt dead body’ দিয়ে ইমেজ সার্চ করে দেখলাম। কয়েকটা ছবি দেখেই মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। তাহলে ভাবুন তো এমন বীভৎস মৃত্যুর পরে শ্যামাবতী ও তার সহচরীরা কোথায় যেতে পারে। অথচ শ্যামাবতী ও তার সহচরীরা সবাই ছিল স্রোতাপন্ন। এছাড়াও তারা মৃত্যুর সময়ে বেদনানুস্মৃতি ভাবনা করে কেউ কেউ সকৃদাগামী বা অনাগামী হয়েছিল। মার্গফল লাভীদের জন্য চারি অপায় বন্ধ। তারা যেভাবেই মরুক না কেন তাদের জন্ম হবে স্বর্গে, বা ব্রহ্মলোকে অথবা মনুষ্যলোকে।

দীর্ঘ নিকায়ের শ্রামণ্যফল সুত্রের অর্থকথায় রাজা বিম্বিসারের যন্ত্রণাময় মৃত্যুর কথা বলা আছে। অজাতশত্রুর আদেশে এক নাপিত বিম্বিসারের পায়ের পাতা ফালি ফালি করে চিরে দিয়ে সেখানে লবণ ও তেল মেখে দিয়ে চামড়া তুলে ফেলে তাতে গরম অঙ্গার ঢেলে দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল। বিম্বিসার ভীষণ যন্ত্রণায় “ও বুদ্ধ, ও ধর্ম, ও সংঘ” করতে করতে মারা গিয়েছিলেন। তার যন্ত্রণাময় মৃত্যুর চেহারাটা কি দেখতে খুব সুন্দর লাগবে বলে মনে হয়? অথচ তিনি জন্মালেন চতুর্মহারাজিক দেবলোকে।

এ তো গেল মার্গফল লাভীদের কথা। এবার অর্হৎদের বীভৎস মৃত্যুর ব্যাপারে আসি। এক্ষেত্রে প্রথমেই মনে আসে উদানের বোধিবর্গের বাহিয় সুত্রের বাহিয় দারুচিরিয়ের কথা। বাহিয়কে বুদ্ধ কেবল বলেছিলেন, দেখলে দেখছি বলে জানবে, শুনলে শুনছি বলে জানবে। বাহিয় সেই সামান্য কথাটা শুনতে শুনতে সেই দাঁড়ানো অবস্থাতেই প্রতিসম্ভিদা (বিশ্লেষণাত্মক জ্ঞান) সহকারে অর্হৎ হয়েছিলেন। কিন্তু প্রব্রজ্যার জন্য ময়লাস্তুপে চীবর খুঁজতে গিয়ে এক গাভীর আঘাতে সেই ময়লাস্তুপেই মারা গিয়েছিলেন। গাভীর গুঁতো খেয়ে তিনি সুখে মরেছেন বলে কেউ বিশ্বাস করবে না। নিশ্চয়ই খুব কষ্ট পেয়ে মরেছেন। তাও আবার ময়লাস্তুপে। আমাদের দেশের নিন্দুকেরা জানলে কি বলবে বলুন তো? ময়লাস্তুপে কোনো অর্হৎ মরে?

পারাজিকা অর্থকথায় আরেক কাহিনীতে বলা হয়েছে, বুদ্ধ একসময় ভিক্ষুদেরকে নিজ নিজ দেহের ৩২টি ঘৃণ্য অংশ নিয়ে অথবা মৃতদেহ নিয়ে ভাবনা করতে বলেছিলেন। তাদের মধ্যে ৫০০ জন ভিক্ষু ছিল যাদের কেউ কেউ মার্গফল লাভী, কেউ কেউ অর্হৎ, কেউ কেউ সাধারণ জন হয়ে ছিল। তখন মিগলণ্ডিক নামের এক ঘাতক দিনে দশজন, বিশজন, পঞ্চাশজন, ষাটজন করে কয়েকদিনের মধ্যেই সেই ৫০০ ভিক্ষুর সবাইকে তলোয়ার দিয়ে মেরে ফেলল। সেটা কীরকম নৃশংস হত্যাকাণ্ড ছিল তা কল্পনা করাও কঠিন। আইএস এর জিহাদীদের মাথা কাটার দৃশ্য দেখে হয়তো কিছুটা ধারণা মেলে। অথবা গুগলে “stabbed to death” লিখে ইমেজ সার্চ দিয়ে দেখতে পারেন কীরকম বীভৎস দেখায় সেই মৃতদেহগুলো। দেখতে সুখকর নয় যদিও।

এখনকার নিন্দুকেরা হয়তো বলতে পারে, অর্হৎ হলে এভাবে মরল কেন? অথচ অর্থকথায় কিন্তু তাদের গতি সম্পর্কে সেখানে বলা হয়েছে, “তত্থ খীণাসৰা অপ্পটিসন্ধিকা, ইতরে অরিযসাৰকা নিযতগতিকা সুগতিপরাযণা, পুথুজ্জনানং পন গতি অনিযতা।” অর্থাৎ তাদের মধ্যে যারা আসবক্ষয় করে অর্হৎ হয়েছেন তারা আর জন্মাবেন না। অন্যান্য আর্যশ্রাবক বা আর্যব্যক্তিগণ সর্বদা সুগতিতেই জন্মাবেন। কিন্তু অনার্য বা মার্গফল লাভী নয় এমন সাধারণজনের গতি অনির্দিষ্ট। তবে যেহেতু শেষমুহুর্তে তারা অশুভ ভাবনা করেছেন তাই মার্গফল লাভ না করলেও সেই ভাবনার বলে তারা সুগতি স্বর্গে জন্মাবেন। বুদ্ধ তাদের মৃত্যু আসন্ন দেখে পরকালে সুগতির উদ্দেশ্যেই এই অশুভ ভাবনার উপদেশ দিয়েছিলেন।

পাঅকের কথা বলি। সেখানে এক ভাবনাকারী তার অতীত জন্মে চোর ছিল। কিন্তু একসময় হাতেনাতে ধরা পড়লে তাকে আচ্ছামত পিটিয়ে বস্তায় ঢুকিয়ে পানিতে ফেলে দেয়া হয়। সে পানিতে ডুবে মারা যায়। পানিতে ডোবা লাশ দেখেছেন কেউ? গুগলে দেখুন। খুব একটা সুখকর দৃশ্য হবে না যদিও। অথচ সে এই জন্মে মানুষ হয়েই জন্মেছে। নিন্দুকদের কথা অনুসারে অপঘাতে মরার পরে তার তো সোজা পাতালে চলে যাওয়ার কথা।

এরকম খুঁজলে আরো অনেক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যেতে পারে। আধুনিককালেও যুদ্ধে মারা গিয়ে অথবা পানিতে ডুবে মারা গিয়ে আবার মানুষ হয়ে জন্মেছে ইত্যাদির কত সত্য ঘটনা ভার্জিনিয়া ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ড. আয়ান স্টিভেনসন, ড. জিম টাকার এবং আরো অনেক গবেষক গবেষণা করে বের করেছেন। সেগুলোর ওয়েবসাইট আছে, ভিডিও আছে। যেকেউ সেগুলো দেখতে পারে।

সোজা কথা হচ্ছে, মৃত্যু কার কীভাবে হচ্ছে সেটা ব্যাপার নয়। কর্মফল থাকলে বীভৎস মৃত্যু সাধারণেরও হয়, অর্হতেরও হয়। তাই নিন্দুকদের যে দাবি, বীভৎস অবস্থায় মরলে প্রেত হয় সেটা সঠিক নয়। সেটা তাদের অজ্ঞতা ও বিদ্বেষমূলক অপপ্রচার মাত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *