আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

শুভ অশুভ এবং শুভ নববর্ষের গল্প

অনেকেই আমাকে শুভ নববর্ষের শুভেচ্ছা হিসেবে কত কত ছবি মেসেজ পাঠিয়েছে। তাদের সবার প্রতি রইল শুভকামনা। আসুন, এই শুভকামনার খাতিরে আপনাদেরকে একটা গল্প শোনাই।

বার্মায় ব্রিটিশ শাসন চলাকালীন সময়ের ঘটনা। থিনগাজা সেয়াদ নামে এক বিখ্যাত সেয়াদ ছিলেন। তিনি একবার মান্দালয় থেকে মলামিয়াই যাবেন বলে দিনতারিখ ঠিক করলেন। কিন্তু তার শিষ্যরা জ্যোতিষশাস্ত্র হিসেব করে জানাল যে সেদিনটা হবে অশুভ দিন। তখন সেয়াদ তাদেরকে বললেন, “ভিক্ষুর কোনো শুভ অশুভ দিন নেই। যারা আমার কথা না মানে তাদের উত্তর ও দক্ষিণের দুই বিহারাধ্যক্ষের কাহিনীটা মনে রাখা উচিত।” এরপর তিনি তাদেরকে সেই কাহিনীটা বললেন।

মায়ানমারের ইরাবতী নদীর উজানে দুটো বিহার ছিল। একটা ছিল গ্রামের দক্ষিণ মাথায়। আরেকটা ছিল গ্রামের উত্তর মাথায়। দুটোই ছিল মহাবিহার। সেগুলোতে বহু ভিক্ষু থাকত। সেই বিহার দুটোর মধ্যে বেশ একটা প্রতিদ্বন্ধিতামূলক মনোভাব বিরাজ করত। উভয় বিহারেরই অধ্যক্ষগণ ছিলেন পণ্ডিত ও ধার্মিক স্বভাবের। কিন্তু দক্ষিণের বিহারাধ্যক্ষ জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাস করতেন। অন্যদিকে উত্তরের বিহারাধ্যক্ষ মোটেও তাতে বিশ্বাস করতেন না।

তখনকার সময়ে বার্মার রাজধানী ছিল ইনওয়া (মান্দালয়ের কাছেই)। একদিন ইনওয়ার রাজদরবার থেকে একটা আমন্ত্রণ এল উভয় অধ্যক্ষের কাছে। রাজপ্রাসাদে একটা জমকালো ধর্মীয় মঙ্গল অনুষ্ঠান হবে। তাতে যেতে হবে। দক্ষিণের বিহারাধ্যক্ষ পরদিনই যেতে মনস্থ করলেন, কারণ পরদিন ছিল শুভদিন। উত্তরের বিহারাধ্যক্ষ তা জেনে ঠিক করলেন তাহলে তিনি তার পরের দিন যাবেন। কারণ তার পরের দিন হবে অশুভ দিন। তিনি শুভ-অশুভ বিশ্বাস করেন না। তাই তিনি সেই অশুভ দিনেই যাবেন।

পরদিন দক্ষিণের বিহারাধ্যক্ষ তার শিষ্যদের নিয়ে একটা সাদা নৌকায় চড়ে রওনা দিলেন। সাদা হচ্ছে শুভ রং। শুভ দিনে শুভ রংয়ের নৌকায় গেলে যাত্রা শুভ হবে। সারাদিন যাত্রা শেষে রাতে তারা একটা গ্রামে পৌঁছলেন। গ্রামের মাতবর নৌকার কাছে এসে বলল, “ভান্তে, আমি আগামীকাল আমার ছোট ছেলের প্রব্রজ্যা করাব বলে ঠিক করেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের গ্রামের বিহারাধ্যক্ষ হঠাৎ আজ দুপুর থেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তাই তিনি আগামীকালের অনুষ্ঠানে থাকতে পারবেন না। আমি আপনাকে সেই অনুষ্ঠানে আসার ফাং করছি। এখান থেকে ইনওয়া হচ্ছে তিন ঘন্টার পথ। কাল আমার অনুষ্ঠান শেষে দুপুরেই ইনওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিতে পারবেন।” দক্ষিণের বিহারাধ্যক্ষ ফাং গ্রহণ করলেন। তারা পরদিন সকালে মাতবরের বাড়িতে অনুষ্ঠানে গিয়ে হাজির হলেন।

ঠিক সেই সকালে উত্তরের বিহারাধ্যক্ষ তার শিষ্যদের নিয়ে একটা নৌকায় করে ইনওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। তার নৌকাটা ছিল কালো রঙের, কারণ কালো হচ্ছে অশুভ রং। হঠাৎ কোত্থেকে বিশাল বাতাস এসে তাদের নৌকার পালে ভর করল। তাদের নৌকা খুব দ্রুতবেগে তরতর করে এগিয়ে গেল। দুপুরের মধ্যেই তারা যে গ্রামে প্রব্রজ্যা অনুষ্ঠান হচ্ছিল সেই গ্রাম পেরিয়ে গেল। নৌকাটা গ্রাম পেরিয়ে ইনওয়ার উদ্দেশ্যে দ্রুতগতিতে চলতে লাগল। কিন্তু ঘন্টাখানেক পরে বেশি দ্রুতবেগে চলার কারণে এক জায়গায় এসে পাথরে ধাক্কা খেয়ে এটি উল্টে গেল। উত্তরের বিহারাধ্যক্ষ ও তার শিষ্যরা সাঁতরে নিরাপদে তীরে উঠে গেল। নদীর তীরে যখন তারা একটু জিরিয়ে নিচ্ছিল তখন শিষ্যরা তাদের অধ্যক্ষকে তিরস্কার করে বলল, “ভান্তে তো গ্রহ নক্ষত্র বিশ্বাস করেন না। জ্যোতিষশাস্ত্রকে অবজ্ঞা করেন। এর ফলেই আজ এই দশা।” উত্তরের বিহারাধ্যক্ষ কিছু বললেন না। তিনি শুধু হতাশ হয়ে নদীর দিকে চেয়ে রইলেন।

এসময় নদীতে দক্ষিণের বিহারাধ্যক্ষের নৌকাটিকে আসতে দেখা গেল। এটিও খুব দ্রুতগতিতে আসছিল। দ্রুতগতিতে আসার দরুণ এটিও সেই জায়গায় এসে পাথরে ধাক্কা খেয়ে উল্টে গেল। দক্ষিণের বিহারাধ্যক্ষ ও তার শিষ্যরা সাঁতরে নিরাপদে তীরে উঠে এলো। তাদেরকে দেখিয়ে এবার উত্তরের বিহারাধ্যক্ষ তার শিষ্যদের বললেন, “ঐ যে তোমাদের দাদু। তার এত জ্যোতিষশাস্ত্রের জারিজুরি সত্ত্বেও আমার চেয়ে খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই। আমাদের দুজনকেই এখন রাজদরবারে ভেজা ইঁদুরের মতো প্রবেশ করতে হবে।”

আশা করি কাহিনীটার মর্মার্থ সবাই বুঝবেন। আবারো সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *