আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

অর্হতের দেহ ফরমালিন দিয়ে রাখলে সমস্যা কোথায়?

বৌদ্ধদের প্রায় সবারই ধারণা, অর্হৎ হলে তার মৃতদেহ পঁচে না। মায়ানমারে এসেও সেটা অনেক ভান্তের কাছ থেকে শুনেছি। তখন প্রশ্ন ওঠে, আমাদের দেশে পূজ্য বনভান্তেকে অর্হৎ বলা হয়। তাহলে তার দেহকে কেন ওষুধ দিয়ে রাখা হলো? কেন ছয় মাস পরপর ওষুধ মেখে দিতে হয়? অতি উৎসাহী কেউ কেউ তো বনভান্তেকে বহু আগে থেকেই ফরমালিন অর্হৎ, ভুয়া অর্হৎ নামে লেখালেখি শুরু করে দিয়েছে। বনবিহারের ভিক্ষুদের পক্ষ থেকে এর কোনো জবাব দিতে কাউকে দেখলাম না। উপযুক্ত জবাব না পেলে তখন শ্রদ্ধাবান উপাসক উপাসিকাদের মনেও স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ চলে আসে। তাই আমি এব্যাপারে আজ সুনলুন সেয়াদের পরিনির্বাণের কাহিনী বলব।

সুনলুন সেয়াদের জীবনী পড়ে জানতে পারলাম, তিনি গৃহী থাকতেই অনাগামী হয়েছিলেন। অনাগামী হওয়ার পরে তার আর বাড়িতে মন টিকছিল না। এদিকে তার স্ত্রীও তাকে ছাড়তে চায় না। অবশেষে একদিন ৪৩ বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে বিহারে গিয়ে শ্রমণ হন। শ্রমণ হওয়ার পরে কয়েকদিনের মধ্যেই অর্হৎ হন। এরপর ১৯৫২ সালের মে মাসে ৭৫ বছর বয়সে পরিনির্বাপিত হন। মৃত্যুর পরে তার মরদেহকে তার ইচ্ছানুসারে ওষুধ দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। এর ১০ মাস পরে তার মরদেহকে একটা অস্থায়ী হলঘরে এনে রাখা হয় যাতে সবাই সেখানে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে পারে, বন্দনা করতে পারে। পরবর্তীতে একটা বিশাল আয়োজনের মাধ্যমে তার মরদেহকে একটা স্থায়ী চৈত্যঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই থেকে সুনলুন সেয়াদের মরদেহ অবিকৃতই রয়ে গেছে।

কথাগুলো পড়েই আমার খটকা লেগেছে। তিনি তো অর্হৎ ছিলেন। তাহলে তাকে ওষুধ দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়েছিল কেন? নাকি আমি ভুল বুঝলাম? তার জীবনীতে ইংরেজিতে লেখা হয়েছে, “His remain were embalmed in a stupa according to his wish.” এর বাংলা অনুবাদ হয়, “তার ইচ্ছানুসারে তার মৃতদেহকে একটা চৈত্যের মধ্যে ওষুধ দিয়ে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছিল।” সোজা কথায় ফরমালিন দিয়ে রাখা হয়েছে। বইটার ইংরেজি অনুবাদে হয়তো ভুল হয়েছে। তাই মূল বার্মিজ বইটা পড়লাম। সেখানে তো আরেক প্যাঁচ। সেখানে ফরমালিন দিয়ে রাখা হয়েছে বলে উল্লেখ নেই। এখন কাকে বিশ্বাস করি?

তাই সুনলুন বিহারের ওয়েবসাইট http://www.sunlun-meditation.net/ এ গিয়ে তাদের সাথে যোগাযোগের ঠিকানা খুঁজলাম। সেখানে সুনলুন সেয়াদের বর্তমান উত্তরসূরী উঃৰর সেয়াদের ফোন নাম্বার নিয়ে ফোন দিলাম। কিন্তু ফোন কেউ ধরল না। দাজানের সময়টাতে মায়ানমারে সবাই ব্যস্ত থাকে। এখন কী করি?

এবার পরিচিত বার্মিজ ভিক্ষুদেরকে এব্যাপারে জিজ্ঞেস করা শুরু করলাম। তারা দেখলাম ফরমালিনের ব্যাপারে ভালোই জানে। কিন্তু সুনলুন সেয়াদের মৃতদেহে ফরমালিন দিয়েছে কিনা সেব্যাপারে প্রথম দুয়েকজন কিছু বলতে পারল না। পরে একজন বলল, তার জানামতে, সুনলুন সেয়াদের দেহটাকে ফরমালিন দিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু তার কথাতে তো আর নিশ্চিত হওয়া যায় না। কোনো অভিজ্ঞ সেয়াদকে জিজ্ঞেস করলে ভালো হয়।

তাই আমি আমাদের বিহারের সেয়াদের কাছে গেলাম। সেয়াদকে বললাম, ভান্তে, সুনলুন সেয়াদের মৃতদেহে কি ফরমালিন ব্যবহার করা হয়েছে নাকি? সেয়াদ বললেন, সুনলুন সেয়াদের কোনো ইচ্ছা ছিল না তার দেহটাকে ফরমালিন দিয়ে রাখা হোক। কিন্তু পরবর্তীতে তার শিষ্যরা সেটাকে ফরমালিন দিয়ে রেখে দিয়েছে।

তখন আমি জিজ্ঞেস করলাম, ভান্তে, আমাদের সবার বিশ্বাস হচ্ছে অর্হতের দেহ পঁচে যায় না। আমাদের সবার বিশ্বাস যে, সুনলুন সেয়াদ উ কবি একজন অর্হৎ ছিলেন। তাহলে তার দেহ কেন ফরমালিন দিয়ে রাখতে হলো?

সেয়াদ বললেন, অর্হতের দেহ পঁচে কি পঁচে না সেব্যাপারে নিশ্চিত করে বলা যায় না। শ্রীলঙ্কায় একসময় এমন ঝাঁকে ঝাঁকে অর্হৎ ছিল যে তাদের কারণে আকাশ ঢাকা পড়ে যেত। তাদের দেহগুলো না পঁচলে তো এতদিনও থাকার কথা, তাই না? অন্তত তাদের হাড়গোড়গুলো তো থাকত। কিন্তু সেসব আছে কি?

তো এই হলো সুনলুন সেয়াদের মৃতদেহকে ফরমালিন দিয়ে রাখার কাহিনী। সুনলুন সেয়াদ অর্হৎ হলেও তার দেহকে ফরমালিন দিয়ে রাখা হয়েছে। তাতে আমাদের দেশের নিন্দুকদের মাথাব্যথা নেই। তারা ঠিকই তাকে নিয়ে গর্ব করে লিখে দেয়, অর্হতের দেহ পঁচে না। অথচ জানেও না এর পেছনের কাহিনী। অন্যদিকে বনভান্তেকে বলে ফরমালিন অর্হৎ। এবার কি তাদের বক্তব্য পাল্টাবে তারা?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *