আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

অর্হতেরা কি অজ্ঞানে মৃত্যুবরণ করে?

আমি আগের পোস্টে সুনলুন সেয়াদের মৃতদেহে ফরমালিন দেয়ার ব্যাপারে লিখেছিলাম। তখন একজনের প্রশ্ন ছিল এরকম:
১।ত্রিপিটকে উল্লেখ আছে,যদি কোন ব্যক্তি,ভিক্ষু অথবা শ্রমণ অর্হৎ হন,তিনি নাকি সৎ জ্ঞানে নির্বাপিত হন।
যদি তাই হয়,আপনার উচিৎ ছিলো জানার যে, উনি কি সৎজ্ঞানে নির্বাপিত হয়েছেন?

এই প্রশ্নটা কিন্তু বনভান্তের ক্ষেত্রেও অনেকের কাছ থেকে শুনেছি। বনভান্তেও নাকি স্কয়ার হাসপাতালে অজ্ঞানে মৃত্যুবরণ করেছেন। মৃত্যুর পরে প্রেতকুলে জন্ম নিয়েছেন। প্রেতকুলে জন্ম নেয়ার ব্যাপারেও আমার বক্তব্য আছে। সেটা নিয়ে পরবর্তীতে লিখব। আপাতত এই সজ্ঞান, অজ্ঞানে মৃত্যু নিয়ে লিখছি।

অর্হৎ হলেন ক্লেশমুক্ত। তাই তার সজ্ঞানে মৃত্যু হবে সেটা তো যৌক্তিক। অর্থাৎ মরার সময় তার স্মৃতি থাকবে। সে যদি মরার আগে ধ্যানে মগ্ন না থাকে তাহলে হয়তো সে কথা বলতে পারে, হাসতে পারে, নড়াচড়া করতে পারে। তখন তাতে কারো কোনো সন্দেহ থাকে না যে সে মরার সময় সজ্ঞানে মৃত্যুবরণ করেছে।

কিন্তু মরার সময় ধ্যানে মগ্ন থাকলে তখন কি বুঝা যায় সে সজ্ঞান নাকি অজ্ঞান? এর সাধারণ উত্তর হচ্ছে, ধ্যানে মগ্ন থাকলে সে অন্যদের মতো নড়াচড়া করে না, কথা বলে না। সে থাকে নিথর, নিশ্চল। এমন নিশ্চল নিথর নির্বাক অবস্থা দেখে তাই কেউ কেউ মনে করে, সে ঘুমাচ্ছে, আর যারা জানে তারা মনে করে, সে ধ্যানে মগ্ন। অন্যদিকে যারা অবিশ্বাসী তারা মনে করে, সে অজ্ঞান, অথবা মরে গেছে।

এর জন্য আমরা বুদ্ধ কীভাবে পরিনির্বাপিত হয়েছিলেন তা দেখতে পারি। বুদ্ধ যখন পরিনির্বাণের সময়ে ধ্যানে প্রবেশ করে নিরোধ ধ্যানে মগ্ন হলেন আনন্দ তখন অনুরুদ্ধ ভান্তেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “ভগবান বুদ্ধ কি পরিনির্বাপিত হলেন নাকি?” অনুরুদ্ধ ভান্তে তখন বলেছিলেন, “বন্ধু, ভগবান পরিনির্বাপিত হন নি। তিনি নিরোধ ধ্যানে মগ্ন।” দেখুন, যেখানে আনন্দ ভান্তের মতো জ্ঞানী ব্যক্তি পর্যন্ত ধ্যানে মগ্ন ব্যক্তিকে বুঝতে পারেন না, সেখানে আজকালকার সাধারণ লোকজন কীভাবে বুঝবে সে সজ্ঞান নাকি অজ্ঞান?

মধ্যমনিকায়ের ১ম খণ্ডের একদম শেষের সুত্রটি হচ্ছে মারতর্জনীয় সুত্র। এই সুত্রে বলা হয়েছে, অতীতে ককুসন্ধ বুদ্ধের অগ্রশ্রাবক ছিলেন সঞ্জীব ভিক্ষু। সঞ্জীব ভিক্ষু একবার এক গাছের নিচে নিরোধ সমাপত্তি ধ্যানে মগ্ন হলেন। তাকে দেখে রাখালরা মনে করলো, “এ তো বড়ই অদ্ভূত! এই শ্রমণটা দেখছি বসা অবস্থাতেই মরে গেছে! চলো, একে দাহ করি।” তারা তখন খড়কুটো, কাঠ ও গোবর এনে সঞ্জীবের গায়ের উপর জড়ো করে আগুন দিয়ে চলে গেল। সেই রাত কেটে গেলে সঞ্জীব ভিক্ষু নিরোধ ধ্যান থেকে উঠে চীবর ঝেড়ে নিয়ে পিণ্ডচারণে গেলেন। রাখালেরা তাকে দেখে বলতে লাগল, “এ তো বড়ই অবাক কাণ্ড। এই শ্রমণ বসা অবস্থাতেই মরে গিয়েছিল। এখন আবার জীবিত হয়েছে।” সেই থেকে তার নাম হয়ে গেল সঞ্জীব ভিক্ষু। দেখলেন তো, নিরোধ সমাপত্তিতে থাকলে তাকে মৃত মনে করে সবাই।

নিরোধ ধ্যানে মগ্ন হওয়াটা অবশ্য সব অর্হতের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই সেটার কথা না হয় বাদই দিলাম। কিন্তু অন্যান্য অনেক ধ্যান রয়েছে, যেমন- চতুর্থ ও উচ্চতর অরূপ ধ্যানগুলো। আরো রয়েছে ফল সমাপত্তি ধ্যান। অর্হৎগণ ফল সমাপত্তি ধ্যানে মগ্ন থাকতে খুব পছন্দ করেন। কিন্তু এসব ধ্যানগুলোতেও বাইরে থেকে দেখে লোকজন তাদেরকে এরকম অজ্ঞান বা মৃত বলে মনে করতে পারে। দীর্ঘনিকায়ের সক্কপঞ্হ সুত্রের অর্থকথায় বলা হয়েছে, প্রথম ধ্যানে মগ্ন ব্যক্তির সামান্য শব্দেও ধ্যান ভঙ্গ হয়। এর কারণ হচ্ছে সে বিদ্বেষসংজ্ঞা পরিত্যাগ করার চর্চা করে নি। কিন্তু চতুর্থ ধ্যান ও উচ্চতর ধ্যানগুলোতে মহাশব্দও তার ধ্যান ভাঙাতে পারে না। তার এমন নিশ্চল অবস্থা দেখে তখন অন্যরা তাকে অজ্ঞান, ঘুমাচ্ছে, মৃত ইত্যাদি কতকিছু যে মনে করে বসে।

অতএব, ধ্যানমগ্ন অবস্থায় কেউ মৃত্যুবরণ করলে বলার উপায় থাকে না সে সজ্ঞান নাকি অজ্ঞান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে। তাই সুনলুন সেয়াদ অথবা বনভান্তে সজ্ঞানে মারা গেছেন নাকি অজ্ঞানে মারা গেছেন সেটা বাইরে থেকে বুঝা যাবে না। তবুও যদি সেরকম কেউ বলে, তাহলে সেটা ধ্যান সম্পর্কে তার অজ্ঞতারই পরিচয় দেয়।

1 thought on “অর্হতেরা কি অজ্ঞানে মৃত্যুবরণ করে?

  1. Bhanthe…
    Could you pls give me the android app project of Tipitaka app you developed. IDo you remember that I asked the same help of you when you doing the app.
    thank you..
    I am a Srilankan monk.
    Ven Kapilawansa.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *