আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

কারা মিথ্যাচার করে? আমি নাকি গুরুবাদীরা?

আজ সন্ধ্যায় কোনোমতে অনাগতবংশ অনুবাদ শেষ করে একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলাম। এই ফাঁকে মেসেঞ্জারে চোখ বুলালাম। দেখলাম একজন Nikolas Chakma নামের একজনের পোস্টের লিংক পাঠিয়েছেন। এরপরে মেসেজে লিখেছেন, এর জবাব দিলে ভালো হবে। আমি সাধারণত সবার মেসেজের জবাব দিই না। শুধু যেসব মেসেজ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে হয় সেগুলোর উত্তর দিই। হাই হ্যালো ধরনের মেসেজগুলোকে আমি দূর থেকে এড়িয়ে চলি। আমার পরিচিতজনরা তাই সরাসরি কাজের কথা বলেন। তবে এক্ষেত্রে বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো। তাই কম্পিউটারে ফেসবুক খুলে মেসেজের লিংকটা একটু পড়ে দেখলাম।

সেখানে লেখক তার পোস্টের শিরোনাম দিয়েছেন, “গান্ধারী বিদ্যা ও আর্যবিদ্যাধরদের বিরুদ্ধে ভদন্ত #ganasanta bikkur মিথ্যাচার ও নিন্দা প্রসংগে…. ”। শিরোনাম পড়েই তো খটকা লাগল। আমি নাকি গান্ধারিবিদ্যা ও আর্যবিদ্যাধরদের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করেছি! ত্রিপিটকে তাদের ব্যাপারে যেগুলো পেয়েছি সেগুলোই তো লিখেছি। পালির রেফারেন্স সহকারে দিয়েছি। ত্রিপিটকের সেই রেফারেন্সগুলো তাহলে মিথ্যাচার? আমি অানমনে মাথা নেড়ে এরপর পড়া শুরু করলাম।

প্রথমেই একগাদা ভিত্তিহীন অভিযোগ। আমি নাকি মিথ্যার সাথে সত্যকে মিশিয়েছি, তালকে তিল করেছি, মনগড়া কথা লিখছি, বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছি। এগুলোর একটাও সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নয়। তাই এব্যাপারে আমি কিছু বলব না। তবে “তালকে তিল করেছি” জেনে একটু অবাক হলাম। মানুষ সাধারণত তিলকে তাল করে। আমি তাহলে উল্টো করেছি, তালকে তিল করেছি!

এরপরে চূলগান্ধারি বিদ্যা ও বিদ্যাধরের ব্যাপারে লিখেছেন। চুলগান্ধারিবিদ্যা কাকে বলে? তিনি লিখেছেন, “সাধারন কথায় যদি সংজ্ঞায়িত করি চুল মানে ছোট সুতরাং চুলগান্ধারী বিদ্যা মানে ছোট বিদ্যাকে বুঝায়।” অথচ দীর্ঘনিকায়ের দীর্ঘনিকায়ের কেবট্ট সুত্রের টীকায় গান্ধারীবিদ্যার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, “চূল়গন্ধারী নাম তিৰস্সতো ওরং মতানং সত্তানং উপপন্নট্ঠানজাননৰিজ্জা।” অর্থাৎ তিন বছরের মধ্যে মারা গেছে এমন সত্ত্বরা মরণের পরে কে কোথায় উৎপন্ন হয়েছে তা জানাটাই হচ্ছে চুলগান্ধারীবিদ্যা। আমি টীকার রেফারেন্স দিলে হয় মিথ্যাচার, আর ওরা নিজের মতো করে বানিয়ে বললে হয় ধর্মপ্রচার। ভালো ভালো।

এরপর চুলগান্ধারি বিদ্যাধর কাকে বলে তা বুঝাতে গিয়ে তিনি তাদের বিদ্যাধরের লাইনের গৎবাঁধা সংজ্ঞা উল্লেখ করলেন, “যে সকল বিদ্যাধরগন শমথ ভাবনার মাধ্যমে ধ্যান বল ও অভিজ্ঞান বল ও অলৌকিক রিদ্ধিপ্রাপ্ত হয় তাদের কে চুল গান্ধারি বিদ্যাধর বলে।” ব্যাখ্যাটা ভালোই। তবে সেটা বিদ্যাধর লাইনের ব্যাখ্যা। আমার কথা হচ্ছে, শমথ ভাবনার বলে যদি কেউ ধ্যানবল পায়, অভিজ্ঞা পায় তখন তাকে অভিজ্ঞালাভী বলা হয়, অষ্টসমাপত্তি লাভী বলা হয়। কিন্তু চূলগান্ধারি বিদ্যাধর হয় বলে ত্রিপিটকের কোথাও আজ পর্যন্ত দেখলাম না।

এরপরে তিনি মহাগান্ধারি বিদ্যা ও আর্যবিদ্যাধরের ব্যাপারে লিখেছেন। মহাগান্ধারিবিদ্যা কাকে বলে? তিনি লিখেছেন, “সাধারণভাবে বিশ্লেষণ করলে মহা মানে বড় সুতরাং মহাগান্ধারি বিদ্যা মানে বড় গান্ধারী বিদ্যাকে বুঝানো হয়। যে সকল চুল গান্ধারী বিদ্যাধরগন শুধু শমথ ভাবনায় সীমাবদ্ধ না থেকে বিদর্শন ধ্যানের মাধ্যমে চতুরার্য্য সত্যকে প্রত্যক্ষ ও উপলব্ধিক্রমে লোকোত্তর প্রজ্ঞার অধিকারী হয় তাদেরকে মহাগান্ধারী বিদ্যা বলে।”

অথচ দীর্ঘনিকায়ের দীর্ঘনিকায়ের কেবট্ট সুত্রের টীকায় বলা হয়েছে, “মহাগন্ধারী তম্পি জানাতি ততো উত্তরিপি ইদ্ধিৰিধঞাণকপ্পং যেভুয্যেন ইদ্ধিৰিধকিচ্চং সাধেতি। তস্সা কির ৰিজ্জায সাধকো পুগ্গলো তাদিসে দেসকালে মন্তং পরিজপ্পিত্ৰা বহুধাপি অত্তানং দস্সেতি , হত্থিআদীনিপি দস্সেতি , দস্সনীযোপি হোতি , অগ্গিথম্ভম্পি করোতি , জলথম্ভম্পি করোতি , আকাসেপি অত্তানং দস্সেতি। সব্বং ইন্দজালসদিসং দট্ঠব্বং।”

এর অর্থ হচ্ছে, মহাগান্ধারীবিদ্যা দিয়ে চূলগান্ধারি বিদ্যার বিষয়গুলো তো জানা যায়ই, সেটা বাদেও মন্ত্র জপ করে বহুধরনের অলৌকিক ঘটনা দেখানো যায়। সেই মহাগান্ধারী বিদ্যাধর সাধক মন্ত্র জপ করে একজন থেকে বহুজন হয়, বহুজন হয়ে একজন হয়; হাতি ঘোড়া ইত্যাদি দেখায়, অগ্নিস্তম্ভ সৃষ্টি করায়, জলস্তম্ভ সৃষ্টি করায়, আকাশে নিজেকে দৃশ্যমান করায়। এই সবই ইন্দ্রজাল বা মায়াবিদ্যা হিসেবে দেখতে হবে।

দেখুন, মহাগন্ধারীবিদ্যার ব্যাপারে তাদের মনগড়া ব্যাখ্যা আর ত্রিপিটকের টীকার ব্যাখ্যার মধ্যে কত তফাত। ত্রিপিটকের টীকায় এই মহাগন্ধারী বিদ্যাকে “ইন্দজালসদিসং দট্ঠব্বং” বা ইন্দ্রজাল বা মায়াবিদ্যার মতো করে দেখা উচিত বলেছে। আপনারা যদি এই ইন্দ্রজাল বা মায়াবিদ্যা শিখতে চান তাহলে ওদের লাইনে চলে যেতে পারেন।

এরপরে তিনি লিখেছেন, “এই বিদ্যাধরগন মার্গফল প্রাপ্ত বলে উনাদেরকে আর্যবিদ্যাধর বলে। আর উনাদের বিদ্যাকে বলা হয় মহাগান্ধারী বিদ্যা।” আমি অবাক হয়ে ভাবি, এই মনগড়া কথাগুলো ওরা সত্যিই বিশ্বাস করে বসে আছে! কী সুন্দর একটা কথা বানিয়ে দিল “আর্যবিদ্যাধর”। আর্যবিদ্যাধর আবার কী জিনিস? ভেবে দেখুন তো, ব্রাহ্মণ হোক, ক্ষত্রিয় হোক, চণ্ডাল হোক, বিদ্যাধর হোক, যদি সে মার্গফল পায়, তাকে বলা হয় আর্য বা আর্যপুদগল বা আর্যশ্রাবক। ত্রিপিটকের কোথাও কি বলা হয়েছে অর্হত্ব বা মার্গফল পেয়ে ব্রাহ্মণ থেকে আর্যব্রাহ্মণ হয়েছে? ক্ষত্রিয় থেকে আর্যক্ষত্রিয় হয়েছে? চণ্ডাল থেকে আর্যচণ্ডাল হয়েছে? বিদ্যাধর থেকে আর্যবিদ্যাধর হয়েছে? উপালি ভিক্ষু জাতে নাপিত ছিলেন। তিনি অর্হৎ হওয়ার পরে কি তাহলে আর্যনাপিত হয়েছেন? মহাপ্রজাপতি গৌতমী ছিলেন শাক্যদের রাণি। তাহলে তিনি কি আর্যরাণি হয়েছিলেন? বুদ্ধ ছিলেন শাক্যবংশের। তাহলে তিনি কি আর্যশাক্য হয়েছিলেন? অথবা তিনি ছিলেন রাজপুত্র। তাহলে কি বুদ্ধত্ব লাভের পরে তিনি আর্যরাজপুত্র হয়েছেন?

আর্যবিদ্যাধর শব্দটা ত্রিপিটকে বা অর্থকথায় থাকলে তবুও মানা যেত। কিন্তু তাদের রামবুদ্ধের মতোই ঐ শব্দটিও ত্রিপিটকের কোনোখানে নেই। এটা হচ্ছে তাদেরই আবিষ্কার মাত্র।

এরপরে চুল গান্ধারী বিদ্যাধর ও মহাগান্ধারী বিদ্যাধর সম্পর্কে বুঝতে দুটি উদাহরণ দিয়েছেন। প্রথমে কচ্চায়ন মহাথেরোর পূর্বজন্মে বিদ্যাধর হওয়ার উদাহরণ টেনে বললেন, “এখানে কাচ্চায়ন মহাথের অতীত জন্মের বিদ্যাধর হলেন চুল গান্ধারী বিদ্যাধর। শমথ ভাবনার মাধ্যমে যে বিদ্যা লাভ করা যায়।” গুরুবাদীরা হয়তো সেকথা বলতে পারে। কিন্তু ত্রিপিটকেই তো আছে তিনি স্রেফ বিদ্যাধর মাত্র, আর কিছু নন। আর তিনি যে লিখলেন, “শমথ ভাবনার মাধ্যমে যে বিদ্যা লাভ করা যায়।” অথচ আমরা ত্রিপিটক থেকে জানি, শমথ ভাবনার মাধ্যমে অষ্ট সমাপত্তি ও পঞ্চ অভিজ্ঞা লাভ করা যায়। সেখানে চূলগান্ধারিবিদ্যার নামগন্ধও নেই।

এরপর পিলিন্দবচ্ছের কাহিনী উল্লেখ করেছেন। বুদ্ধের আমলে পিলিন্দৰচ্ছ পরিব্রাজক ছিলেন। তিনি চূলগান্ধারী বিদ্যা শিক্ষা করে আকাশে উড়তে পারতেন এবং অন্যদের মনের খবর বলে দিতে পারতেন। কিন্তু বুদ্ধ উৎপন্ন হওয়ার পর থেকে তার সেই বিদ্যা আর কাজ করত না। তখন তার পূর্ববর্তী গুরুর সেই উক্তি স্মরণ হলো। তখন তিনি ভাবলেন, “আমার চুল গান্ধারী বিদ্যার ক্ষমতা বিলুপ্ত হওয়ার কারণ নিশ্চয় এক মহাগান্ধারী বিদ্যাধর এখানে আগমন করেছেন। এখন গৌতম বুদ্ধ রাজগৃহে আগমন করেছেন বলে শুনেছি গৌতম বুদ্ধ তাহলে নিশ্চয় একজন মহাগান্ধারী বিদ্যাধর হবেন “। এই ভেবে তিনি ভগবান গৌতম বুদ্ধের কাছে উপস্থিত হন এবং বুদ্ধের কাছ থেকে প্রব্রজ্যার প্রার্থনা করেন।

তার কথা ঠিকই আছে। অর্থকথায়ও সেরকম আছে। অর্থাৎ এখানে তিনি সত্যিটা তুলে ধরেছেন। কিন্তু এরপরেই তিনি লিখেছেন, “এখানে পিলিন্দবচ্ছ ছিলেন চুলবিদ্যাধর আর ভগবান বুদ্ধ হলেন মহাগান্ধারী বিদ্যাধর। অর্থাৎ ভগবান বুদ্ধের বিদ্যা হলো মহাগান্ধারি বিদ্যা।”

দেখুন তো, সত্যের সাথে সুযোগ বুঝে একটা মিথ্যার লেজ লাগিয়ে দিয়েছেন। খেয়াল করুন, পিলিন্দবচ্ছ যেহেতু চুলগান্ধারি বিদ্যাধর ছিলেন তিনি তাই স্বভাবতই বুদ্ধকে মহাগন্ধারী বিদ্যাধর ভেবেছেন। সেটা পিলিন্দবচ্ছ মনে করতেই পারেন। তিনি মনে করলেই বুদ্ধ মহাগান্ধারি বিদ্যাধর হয়ে গেলেন? কিন্তু বুদ্ধ কি কখনো তার কোনো সুত্রে নিজেকে মহাগান্ধারি বিদ্যাধর বলে দাবি করেছেন? সারিপুত্র মোগ্গলায়ন কখনো মহাগান্ধারি বিদ্যাধর বলে দাবি করেছেন? তার অন্যান্য অর্হৎ শিষ্যরাও কখনো দাবি করেছেন? সারা ত্রিপিটক খুঁজেও এমনটা কখনো কেউ দেখাতে পেরেছে? এই কথা আমাদের সেয়াদগণের সামনে এসে বলার সাহস আছে তাদের?

তিনি এরপর লিখেছেন, “১৮ শতকের অন্যতম সংগীতিকারক পরম পূজ্য লেডি ছেয়াদ লিখিত “বিদ্যা মার্গ দিপনী” বইটি পড়ার জন্য ভান্তের কাছে অনুরোধ রইল।” আমি বিদ্যামার্গ নিয়ে অত আগ্রহী নই। তাই ওটা পড়ার আমার কোনো খায়েশ নেই।

সবশেষে তার জোর দাবি হচ্ছে, ভগবান বুদ্ধের বিদ্যাই মহাগান্ধারী বিদ্যা। হায়রে মানুষ। যিনি একটা লেখা পড়ে কোনটা অনুমান আর কোনটা সত্যি সেটার পার্থক্য করতে পারেন না, তার দাবি কতটুকু যৌক্তিক সেটা আর আমি লিখলাম না। এ যেন অন্ধের সেই দাবির মতো, যে একটা হাতির লেজে স্পর্শ করে তার অনুমানটাকেই সত্যি মনে করে জোর দাবি করে, হাতি হচ্ছে একটা ঝাড়ু! বাচ্চারাও তো সেই কথা শুনে হাসবে। এমন মগজ ধোলাই হয়ে যাওয়া লোকদেরকে আর কী বলা যায় বলুন তো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *