আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

কীভাবে বৌদ্ধধর্মের ভেজাল জিনিসগুলোকে চিনবেন

বৌদ্ধধর্মে অনেক ভেজাল জিনিস ঢুকে পড়েছে। একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু হিসেবে আমি স্বভাবতই চাইব, এসব ভেজাল জিনিস যাতে বুদ্ধশাসনে শেকড় গাড়তে না পারে। কিন্তু বুদ্ধশাসনে কোনগুলো ভেজাল জিনিস তা কীভাবে বুঝবো? সবাই তো তাদের কথাগুলো বুদ্ধবাণী বলে প্রচার করে বেড়ায়।

ভাগ্য ভালো যে বুদ্ধ মহাজ্ঞানী ছিলেন। তিনি জানতেন বৌদ্ধধর্মে ভবিষ্যতে এধরনের ভেজাল ঢুকে পড়বেই। তাই তিনি মহাপরিনির্বাণের আগেই ভেজালগুলো চেনার উপায় বলে দিয়ে গেছেন। সেটা আছে দীর্ঘনিকায়ের মহাপরিনির্বাণ সুত্রের চারিমহাপ্রদেশ কথায় (দী.নি.২.৩.১৮৭)। আসুন দেখি, বৌদ্ধধর্মে ভেজাল চেনার সেই উপায়টি কি?

মহাপরিনির্বাণ সুত্রে তিনি বলেছেন, হে ভিক্ষুগণ, এখানে কেউ কেউ বলতে পারে, “এটাই ধর্ম, এটাই বিনয়”। তাহলে তার কথায় সায় দেয়াও উচিত নয়, আবার প্রত্যাখ্যান করাও উচিত নয়। তাতে সায় না দিয়ে, প্রত্যাখ্যান না করে তাদের কথাগুলো ভালোমতো শুনে নিয়ে সেগুলোকে সুত্রের সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে, বিনয়ের সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে। সেগুলো যদি সুত্রের সাথে না মেলে, বিনয়ের সাথে না মেলে, তাহলে তোমাদের সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত, “এটা বুদ্ধের কথা নয়। এই ভিক্ষু ভুল জিনিস গ্রহণ করেছে মাত্র।” সেটাকে তোমরা বর্জন কর। আর যদি সেটা সুত্রে ও বিনয়ে মেলে, তাহলে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত, “নিশ্চয়ই এটা বুদ্ধের কথা। এই ভিক্ষু সঠিক জিনিসই গ্রহণ করেছে।” সেটাকে তোমরা ধারণ কর।

অথবা কেউ কেউ বলতে পারে, “অমুক বিহারে অমুক সঙ্ঘ থাকেন। তারা খুবই পণ্ডিত। তাদেরকে আমি বলতে শুনেছি এটাই ধর্ম, এটাই বিনয়।” সেক্ষেত্রেও বিষয়টা সেভাবেই সুত্র ও বিনয়ের সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে।

অথবা কেউ কেউ বলতে পারে, “অমুক বিহারে কয়েকজন থেরো মহাথেরো থাকেন যারা অনেক কিছু জানেন, ধর্মধর, বিনয়ধর, মাতিকাধর। তাদেরকে আমি বলতে শুনেছি এটাই ধর্ম, এটাই বিনয়।” সেক্ষেত্রেও বিষয়টা সেভাবেই সুত্র ও বিনয়ের সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে। (দীর্ঘনিকায়=>মহাপরিনির্বাণ সুত্র.১৮৮)

অতএব কারো কাছ থেকে শুনেই আমাদের সেটা বুদ্ধের কথা বলে গ্রহণ করা উচিত নয়। সেটাকে আগে সুত্র ও বিনয়ের সাথে মিলিয়ে দেখা উচিত। বর্তমানে কম্পিউটার ও মোবাইলে ত্রিপিটকের সুত্র ও বিনয় খুবই সহজলভ্য। যারা পালি জানেন তারা তো আরো সহজেই সুত্র ও বিনয়ে মিলিয়ে দেখতে পারেন কোনগুলো ত্রিপিটকে আছে, কোনগুলো ত্রিপিটকে নেই।

তবে এক্ষেত্রে ভিক্ষুদের ভূমিকাই মুখ্য হওয়া উচিত। কারণ গৃহীরা নানা কাজে ব্যস্ত থাকে। তাদের অত যাচাই বাছাই করার মতো সময় কই? অথবা সময় থাকলেও পালিতে দক্ষতা না থাকায় অনেক সুত্র, অর্থকথা তারা বুঝতে পারে না। তাই ভিক্ষুরা যা বলে তারা সেটাকেই খুশিমনে গ্রহণ করে থাকে। একারণে সেই যাচাই বাছাইয়ের কাজে ভিক্ষুদেরই এগিয়ে আসা উচিত।

তাই আমার প্রাণখোলা আহ্বান রইল- আসুন আমরা আন্দাজে বৌদ্ধধর্ম না করি। সুত্র ও বিনয়ের সাথে মিলিয়ে তবেই সেটা গ্রহণ করি।

2 thoughts on “কীভাবে বৌদ্ধধর্মের ভেজাল জিনিসগুলোকে চিনবেন

  1. ভান্তে, বন্দনা।
    “সম্প্রতি এই গ্রুপে প্রকাশিত “গৌতমের গৃহত্যাগ : মিথ এবং বাস্তব” শীর্ষক আমার একটি লেখার বিরুদ্ধে উজ্জ্বল বড়ুয়া বাসু মহাশয় কিছু সমালোচনা করেছেন। আমার দিক থেকে সেই সমালোচনার উত্তর দেওয়া কর্তব্য বলে মনে করি।

    বিস্তারিত লিখছি না। যারা আমার লেখাটি এবং উজ্জ্বল বাবুর সমালোচনাটি পড়েছেন, তাঁরা অবশ্যই বুঝতে পারবেন। মূল সমস্যা হল মজ্ঝিম নিকায়ের অন্তর্গত আরিয়পরিয়েসনা সুত্তের একটি বাক্যকে কেন্দ্র করে। পালি বাক্যটি হল –

    “সো খো অহং ভিকখবে অপরেন সময়েন দহরোব সমানো সুসুকালকেসো ভদ্রেন যোব্বনেন সমন্নাগতো পঠমেন বয়সা অকামকানং মাতাপিতুনং অসসুমুখানাং রুদন্তানং কেসমসসুং ওহারেত্বা কাসায়ানি বত্থানি অচ্ছাদেত্বা অগারস্মা অনগারিয়ং পব্বজিং।”

    ধর্মানন্দ কোসম্বী তাঁর “ভগবান বুদ্ধ” বইতে উপরের পালি বাক্যটির নিম্নরূপ অনুবাদ করেছেন (কোসম্বীর মূল বইটি মারাঠি ভাষায় রচিত হওয়ায় নীচের বাংলা অনুবাদটি প্রকৃতপক্ষে অনুবাদের অনুবাদ) –

    “‘হে ভিক্ষুগণ, যদিও আমার তখন তরুণ বয়স, আমার একটি চুলও পাকে নাই, আমি পূর্ণ যৌবনাবস্থায় ছিলাম এবং আমার পিতামাতা আমাকে অনুমতি দিতেছিলেন না ও চোখের জলে তাহাদের মুখ ভিজিয়া গিয়াছিল, আর তাঁহারা অনবরত কাঁদিতেছিলেন, তথাপি (এসব গ্রাহ্য না করিয়া) আমি এইরূপ ভাবিতে ভাবিতে, কিছুকাল পর, মাথা মুড়াইয়া, কাষায় বস্ত্র দ্বারা দেহ আচ্ছাদন করিয়া, ঘরের বাহির হইয়া পড়িলাম।”

    এই অনুবাদ থেকে স্পষ্ট মনে হয়, গৌতম তাঁর পিতামাতাকে জানিয়ে তাঁদের সামনেই গৃহত্যাগ করেছিলেন, লুকিয়ে রাতের অন্ধকারে করেন নি, যা কিনা আমরা বুদ্ধের তথাকথিত ‘জীবনী’তে পড়ে থাকি। কিন্তু উজ্জ্বলবাবুর মতে এই অনুবাদ সঠিক নয়। তাঁর মতে সঠিক অনুবাদটি হল এরকম (যা বেণীমাধব বড়ুয়া তাঁর মজ্ঝিম নিকায়ের বাংলা অনুবাদে করেছেন) –

    “হে ভিক্ষুগণ! সেই আমি পরে যখন তরুণ, নবীন, কৃষ্ণকেশ এবং ভদ্র-যৌবনসম্পন্ন তখন স্নেহশীল ও অনিচ্ছুক মাতাপিতাকে কাঁদাইয়া, কেশ-শ্মশ্রু ছেদন করিয়া, কাষায় বস্ত্রে দেহ আচ্ছাদিত করিয়া আগার হইতে অনাগারিকরূপে প্রব্রজিত হই।”

    মজার ব্যাপার হল, এই অনুবাদ থেকে আবার এরকম মনে হওয়ার কোন কারণ নেই যে, গৌতম তাঁর মাতাপিতার সামনেই গৃহত্যাগ করেছিলেন। মাতাপিতাকে না জানিয়ে লুকিয়ে গৃহত্যাগ করলেও তাঁর পক্ষে এইভাবে বলা সম্ভব।

    তাহলে কোনটা ঠিক – ধর্মানন্দ কোসম্বীর অনুবাদ না বেণীমাধব বড়ুয়ার অনুবাদ? আমরা যদি দুটি অনুবাদ পাশাপাশি রেখে তুলনা করি, তাহলে দেখতে পাব যে, একটি জায়গা ছাড়া দুটি অনুবাদেরই বক্তব্য হুবহু মিলে যায়। কোসম্বীর অনুবাদের প্রায় সব কথাই বেণীমাধব বড়ুয়ার অনুবাদে পাওয়া যায়। কিন্তু কোসম্বী এক জায়গায় লিখেছেন, “চোখের জলে তাহাদের মুখ ভিজিয়া গিয়াছিল।” লক্ষ্য করুন, ঠিক এই কথাটি কিন্তু বেণীমাধব বড়ুয়ার অনুবাদে কোথাও নেই। অথচ এই কথাটিই স্পষ্ট করে দেয় যে, গৌতম তাঁর মাতাপিতার সামনেই গৃহত্যাগ করেছিলেন। নচেত তাঁর পক্ষে দেখা সম্ভব ছিল না যে, চোখের জলে তাঁর মাতাপিতার মুখ ভিজে গিয়েছিল। তিনি অনুমানে বলতেই পারেন যে, তিনি চলে আসার পরে তাঁর মাতাপিতা কাঁদছিলেন। কিন্তু সেই কান্নার এরকম দৃশ্যমান বর্ণনা একমাত্র তখনই দেওয়া সম্ভব যদি তিনি সেইসময় সেখানে উপস্থিত থাকেন।

    উজ্জ্বলবাবুর মতে, কোসম্বী এই অংশটি জোর করে ঢুকিয়ে দিয়েছেন, মূল পালিতে এটি নেই। উজ্জ্বলবাবু পণ্ডিত মানুষ, তিনি পালি আমাদের চেয়ে অনেক বেশি জানেন সন্দেহ নেই। কিন্তু আমাদের মতো অল্পজ্ঞ মানুষও সাদা চোখে বুঝতে পারি, এই অংশটি কোসম্বী ঢোকান নি, বরং স্রদ্ধেয় বেণীমাধব বড়ুয়াই কোন কারণে ছেড়ে গিয়েছেন। মূল পালির “অসসুমুখানাং” শব্দটি বেণীমাধব বড়ুয়া অনুবাদ করেন নি আর ওই শব্দটির অর্থই হল, “অশ্রুতে মুখ ভিজে গিয়েছিল।” বেণীমাধব বড়ুয়া হয়তো এত বড়ো বাক্য একটানে অনুবাদ করতে গিয়ে ওই শব্দটি কোনভাবে ছেড়ে গিয়েছেন।

    কোসম্বীর অনুবাদে যে কোন ভুল নেই, তার সমর্থন মজ্ঝিম নিকায়ের মান্য ইংরেজি অনুবাদেও পাওয়া যায়। Bhikkhu Nanamoli ও Bhikkhu Bodhi তাঁদের “The Middle Length Discourses of the Buddha” গ্রন্থে আলোচ্য অংশটির নিম্নরূপ অনুবাদ করেছেন –

    “Later, while still young, a black-haired young man endowed with the blessing of youth, in the prime of life, though my mother and father wished otherwise and WEPT WITH TEARFUL FACES, I shaved off my hair and beard, put on the yellow robe, and went forth from the home life into homelessness.”

    http://www.accesstoinsight.org নামক বিখ্যাত ওয়েবসাইটে Thanissaro Bhikkhu ওই অংশটির প্রায় একই রকম অনুবাদ করেছেন –

    “So, at a later time, while still young, a black-haired young man endowed with the blessings of youth in the first stage of life — and while my parents, unwilling, WERE CRYING WITH TEARS STREAMING DOWN THEIR FACES — I shaved off my hair & beard, put on the ochre robe and went forth from the home life into homelessness.”

    লক্ষ্য করুন, উভয় অনুবাদকই বলছেন, অশ্রুতে তাঁদের মুখ ভিজে গিয়েছিল।

    উজ্জ্বলবাবুর সমালোচনার মধ্যে মূল বিষয় ছিল এটিই। আশা করি, আমি এর যথাযথ উত্তর দিতে পেরেছি। এছাড়া তিনি কিছু অবান্তর নিন্দাসূচক কথাবার্তা বলেছেন (যেরকম তিনি এর আগেও করেছিলেন)। সেসবের উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করি না।”

    তাহলে,‌ তথাগত বুদ্ধের গৃহত্যাগের আসল ঘটনাটি কীরূপ ভান্তে?

  2. ভান্তে, বন্দনা।
    কালাম সূত্রের ধর্মত বিস্তারিত ব্যাখ্যাটি কী?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *