আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

কেন আমি রামবুদ্ধকে স্বীকার করি না

অনেকের অভিযোগ, আমি নাকি রামবুদ্ধকে স্বীকার করি না এবং সেই সাথে অনাগত দশবুদ্ধেরও বিরোধী। এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে এবং সত্যধর্ম প্রচারের স্বার্থে এই লেখা লিখলাম।

আমার কথা হচ্ছে, অনাগতে লক্ষ কোটি বুদ্ধ আসলেও আমি বিরোধী নই। কিন্তু কেউ যখন বলে, “অনাগতে অমুক অমুক বুদ্ধ আসবেন” তখন আমি তাদেরকে রেফারেন্স দেয়ার অনুরোধ করি। কারণ নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স ছাড়া আন্দাজে কোনোকিছু আমি গ্রহণ করি না। আর আমার জন্য নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স হচ্ছে ষষ্ঠসঙ্গীতিতে অনুমোদিত ত্রিপিটক ও অন্যান্য গ্রন্থগুলো। আমি সেগুলোকেই রেফারেন্স হিসেবে মানি।

তখন রামবুদ্ধের রেফারেন্স হিসেবে তারা প্রায়ই উল্লেখ করে অনাগতবংশের কথা। আমি অবাক হয়ে যাই, যখন তারা বইটা না পড়েই আন্দাজে বলে যে, অনাগতবংশে রামবুদ্ধের কথা আছে। অনাগতবংশ বইটা ষষ্ঠসঙ্গীতির ভান্তেগণ অনুমোদন করেন নি। তবুও তাদের দাবির প্রেক্ষিতে আমি সেটা পড়ে দেখেছি রামবুদ্ধের ব্যাপারে সত্যিই কিছু লেখা রয়েছে কিনা। কিন্তু দেখলাম সেটা হচ্ছে আর্যমিত্র বুদ্ধের বিবরণ মাত্র। রামবুদ্ধের ছিঁটেফোঁটাও সেখানে নেই। এভাবে অনাগতবংশে আছে আছে বলে তারা যে কীরকম মিথ্যাদাবি প্রচার করে বেড়ায় আমি জেনে অবাক হয়ে যাই। এই হচ্ছে অবস্থা।

আপনাদের প্রতিও আহ্বান রইল, “অনাগতবংশ” বইটা পড়ুন। সেখানে যদি রামবুদ্ধের কথা থাকে তাহলে আমাকে দেখান। তখন আমি সানন্দে মেনে নেব রামবুদ্ধকে। তার আগে নয়। (অনাগতবংশ বইটা খুব ছোট। মূল পালিটা মাত্র এগার পৃষ্ঠার। কেউ যদি চান তাহলে আমি পালি বা ইংরেজি থেকে অনুবাদ করে দিতে পারি। একদিনেই অনুবাদ করা যাবে আশা করি।)

এরপর কেউ কেউ বলে- “সদ্ধর্মরত্ন চৈত্য”, ডা. সিতাংশু বিকাশ বড়ুয়ার “অনাগত বুদ্ধ” ও আরেক লেখকের লেখা “বুদ্ধ বংসো পরিক্রমা” নামক গ্রন্থে নাকি রামবুদ্ধের কথা আছে। এগুলোকে এরা কীভাবে নির্ভরযোগ্য মনে করে আমি বুঝি না। ত্রিপিটকে নেই, কিন্তু অন্য লেখকগণ লিখে গেছেন, তাই আমরা একটা কিছু আছে বলে মেনে নেব, সেটা কি হতে পারে? তাহলে তো মুসলমানরা যদি কোরবানি বা জেহাদের জন্য কোরআন থেকে যে রেফারেন্স দেয়, সেটাও মানতে হয়। হিন্দুদের সাগর মন্থনের কাহিনীকেও মানতে হয়। কেউ কেউ হয়তো সেগুলো মানতে পারে। আমি কিন্তু বুদ্ধবাণী ত্রিপিটককেই মানি। এর বাইরে অন্যকিছু নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই।

এরপরে তারা দ্বীপবংশ বইয়ের রেফারেন্স দেয়। দ্বীপবংশে রাম নামে খুঁজলাম। দেখলাম সেখানে শাক্যদের বংশধরদের কথা বলতে গিয়ে দুয়েকবার তাদের সন্তানদের নাম “রাম” হিসেবে উল্লেখ আছে। আর রামবুদ্ধের ভক্তরা বিষয়টা না পড়েই হৈ হৈ করে ওঠে, এই যে দ্বীপবংশে রামবুদ্ধের কথা আছে। এরা কি পড়তে জানে না নাকি?

এরপরে তারা “রসবাহিনী” নামক বইয়ের কথা বলে। রসবাহিনী বইটা ঠিক আছে। এই বইটা ষষ্ঠসঙ্গীতির সঙ্গীতিকারকগণ অনুমোদন করেছেন। তবে সেখানে যে রামের কথা বলা হয়েছে সে তো দশরথ জাতকের রাম। তিনি ছিলেন আমাদেরই গৌতম বুদ্ধ। রামবুদ্ধকে কোথায় দেখলো তারা?

রামবুদ্ধের ভক্তরা এরপরে দশরথ জাতকের কথা বলে। তার জন্য VRI ত্রিপিটক, MYANMAR ত্রিপিটক ও THAI ত্রিপিটকের জাতকের রেফারেন্স দেয়। সেখানে নাকি রামবুদ্ধের কথা আছে। আচ্ছা, এরা কি বোঝে জাতক কাকে বলে? জাতক হচ্ছে আমাদের গৌতম বুদ্ধের অতীত জন্মের কাহিনী। দশরথ জাতকে আমাদের গৌতমবুদ্ধই তখন রাম হিসেবে জন্মেছিলেন। আর সেখানে রাম শব্দটি দেখেই তাদের রামবুদ্ধের কথা মনে পড়ে গেল? এদের বোধবুদ্ধি নিয়ে এখন আমার সত্যিই সন্দেহ দেখা দিচ্ছে।

এরপরে তারা ‘দশবোধিসত্তউৎপত্তিকথা’ গ্রন্থের নাম উল্লেখ করে। কিন্তু গ্রন্থটি ষষ্ঠ সঙ্গীতির সঙ্গীতিকারকগণ অন্তর্ভুক্ত করেন নি। তাই সেটাকে আমি আর খুঁজেও দেখি নি।

এরপরে বৃটিশ জাদুঘরে রক্ষিত পান্ডুলিপির রেফারেন্স দেয়। আপনাদেরকে জানিয়ে দিই- আমরা থেরবাদী বৌদ্ধভিক্ষুরা বৃটিশ জাদুঘরে রক্ষিত পাণ্ডুলিপি অনুসারে চলি না। আমাদের নিজস্ব ত্রিপিটক আছে, নিজস্ব ধর্মবিনয় আছে। বৃটিশ জাদুঘরে কী আছে না আছে সেটা আমাদের জানার বিষয় নয়।

এরপরে তারা সোতথকী এবং মধুরথবাহিনী নামক বইয়ের উল্লেখ করে। এসব বই এরা কোত্থেকে পায় কে জানে। আমার সন্দেহ হয়, এগুলো তাদেরই বিদ্যাধরদের লাইনের বই। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে সেগুলো ষষ্ঠ সঙ্গীতির সঙ্গীতিকারকগণ অন্তর্ভুক্ত করেন নি। তাই সেগুলো আমি নির্ভরযোগ্য বলে মনে করি না।

সবশেষে তারা তাদের গুরুভান্তে উ পঞ্ঞা জোত মহাথেরোর গ্রন্থগুলোর রেফারেন্স দেয়। তার লেখা গ্রন্থগুলো আমি পড়েছি। খুব প্রাঞ্জল করে লেখা। তিনি অনেককিছু করেছেন, অনেক কিছু লিখেছেন যেগুলোর জন্য আমি মনেপ্রাণে তাকে সাধুবাদ দিই। কিন্তু তিনি সেইসাথে অনেককিছু করেছেন, অনেককিছু লিখেছেন যেগুলো আমি গ্রহণ করি না, সমর্থন করি না। তিনি রামবুদ্ধের ব্যাপারে লিখলেও আমি সেটা আগে ত্রিপিটকের সাথে মিলিয়ে দেখব। ত্রিপিটকে যদি না থাকে, তাহলে অর্থকথায় দেখব। অর্থকথায় যদি না থাকে তাহলে টীকায় দেখব। টীকায় যদি না থাকে তাহলে সঙ্গীতিকারক ভান্তেদের অনুমোদিত অন্যান্য গ্রন্থগুলোতে দেখব। সেগুলোতে না পেলে আমি সেটা কোনোমতেই গ্রহণ করতে রাজি নই।

এভাবেই আমি ত্রিপিটকের বিনয় ও সুত্রের ভিত্তিতে যেকোনোকিছু বিচার বিবেচনা করি। এর ভিত্তিতেই আমি আমার ভিক্ষু জীবন যাপন করি। প্রাচীন ভান্তেগণ নিজেদের জীবনের মায়া পর্যন্ত ত্যাগ করে ত্রিপিটককে আগলে আগলে রেখেছিলেন যেন তাতে কোনো ভেজাল মিশে না যায়। সেই ভান্তেদের উত্তরসূরী ভিক্ষু হিসেবে তাই সত্যধর্মকে রক্ষা করার জন্য আমারও একটা দায়িত্ব আছে। আমি ধর্মবিনয় শিক্ষা ও তার যথাযথ চর্চা এবং যথাসম্ভব প্রচারের মাধ্যমে সেই দায়িত্ব পালন করে যাব আজীবন।

আরেকটা কথা। ব্যক্তিকে নয়, ত্রিপিটককে দেখতে বলেছেন বুদ্ধ। তাই যেসমস্ত দায়ক ও ভিক্ষু রামবুদ্ধের প্রমাণে ব্যস্ত, তাদের প্রতি আমার অনুরোধ রইল, মিথ্যার পিছনে ছুটে সময় নষ্ট করবেন না। আপনাদের গুরুভান্তে বলেছে বলেই ধরে থাকবেন না। ত্রিপিটক এখনো আছে। বাংলায় সেগুলো অনুবাদ হয়েই গেছে। সেগুলো পড়ে নিন। যদি না পান তো কোনো ত্রিপিটকে অভিজ্ঞ ব্যক্তির কাছ থেকে জেনে নিন। আন্দাজে বৌদ্ধধর্ম করবেন না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *