আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

গুরুর গুরু ছাঁইহ্রে সেয়াদ

আমাদের এখানে বিদ্যাধরদের লাইনে ভিক্ষু শ্রমণ নেই। সবাই পরিয়ত্তির পরীক্ষাগুলোতে কীভাবে পাস করবে, কীভাবে ভালো নম্বর পাবে তা নিয়ে ব্যস্ত। তাই এসব ভিক্ষুদেরকে গুরুভান্তের গুরুর ছবি দেখিয়ে লাভ হলো না। তারা তাকে চিনল না। আমি মনে মনে বললাম, তোদের দেশের অর্হৎকে তোরা চিনলি না, অথচ আরেক দেশের লোকজন ঠিকই চিনে বসে আছে!

পরে বিদ্যাধরদের লাইন সম্পর্কে জানেন এমন একজনকে ছবিটা দেখালাম। তিনিও চিনতে পারলেন না। তিনি বললেন, মায়ানমারে প্রাচীনকালে প্রচুর বিদ্যাধর হওয়ার সাধনা করা হতো। এদের মধ্যে তিনজন খুব নামকরা বিদ্যাধর ছিলেন। এরা হচ্ছেন ယက္ကန္းစင္ေတာင္ ဆရာေတာ္ (য়াক কানঃ চিন তাঁও সেয়াদ। তিনি ভিক্ষু ছিলেন), ဘိုးဘိုးေအာင္ (বোবো আওং। ইনি ছিলেন পোথুদো। অর্থাৎ সাদা বস্ত্রধারী ব্রহ্মচারী।) ဘိုးမင္းေခာင္ (বোমিন খাওন। ইনি ছিলেন সন্ন্যাসী।) এই ছবিটা এদের কারোরই নয়।

এরপর তিনি আমাকে এর নাম দিতে বললেন। ছবিতে বাংলায় নাম লেখা আছে “ছাঁইহ্রে সেয়াদ”, কিন্তু তিনি তা বুঝলেন না। তাই বার্মিজ বানানে কী হতে পারে তা লিখে দেখালাম। তা দেখে তিনি বললেন, সানশে সেয়াদ হতে পারে। কারণ সান মানে হচ্ছে চুল। শে মানে হচ্ছে লম্বা। তাই সানশে সেয়াদ মানে হচ্ছে লম্বা চুলের সেয়াদ। যাই হোক নামটা তো উদ্ধার হলো, কিন্তু এই নামের কাউকে তিনি মনে করতে পারলেন না। তিনি বললেন, পরে খোঁজ নিয়ে দেখবেন।

তবে তিনি বললেন, ছবিটা কোনো অর্হৎ ভিক্ষুর হতে পারে না। সেটা কোনো বিদ্যাধরেরই হবে। এরপর বিদ্যাধরদের সম্পর্কে অনেক কিছু বললেন। তিনি বললেন, বিদ্যাধররা সাধারণত মরে গিয়ে বিদ্যাধর হয়, অর্থাৎ তাদের আগের চেহারা থাকে ঠিকই, কিন্তু দেহটা নতুন হয়, যেটা দিয়ে হাজার বছর বেঁচে থাকা যায়। আমি বললাম, সেটা কীভাবে সম্ভব? তিনি বললেন, বুদ্ধের ভাষায় সেটা হচ্ছে নিম্নশ্রেণির দেবতা বা প্রেত হিসেবে পুনর্জন্ম হওয়া। তারা সেই বিদ্যার টানে সেরকম প্রেত বা নিম্নশ্রেণির দেবতা হয়ে হাজার বছর বেঁচে থাকে। সে যাই হোক, তারা নাকি তাদের অনুসারীদের কাছে দেখা দেয়, তাদেরকে সাধনার লাইনে অগ্রগতির পথ দেখায়। লেডি সেয়াদ থেকে শুরু করে বর্তমানে আছেন এমন হচ্ছেন মহাবোধিমিন সেয়াদ তারাও বিদ্যা জানতেন। মহাবোধিমিন সেয়াদ গৃহী থাকাকালীন সময়ে তার কাছে বিদ্যাধর দেখা দিয়েছিল। মহাবোধিমিন সেয়াদ অনেক বই লিখেছেন, কিন্তু বিদ্যা নিয়ে টুঁ শব্দটি করেন নি।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে তারা ভিক্ষু হয়ে বিদ্যাধরদের পূজা করেন? তিনি বললেন, না না। মহাবোধিমিন সেয়াদ এসব করেন না। গৃহীকালে করতেন। লেডি সেয়াদও নাকি বিদ্যা জানতেন, বিভিন্ন অলৌকিক শক্তি জানতেন। তিনি ছিলেন খুবই মেধাবী ভিক্ষু। পরিয়ত্তি, প্রতিপত্তি সব দিক দিয়ে দক্ষ।

আমি ভাবি, এসব কী শুনছি! বহু মাস আগে আমারই এক সতীর্থ ভিক্ষু পাঅক সেয়াদের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল। সে এই বিদ্যাধরদের লাইনের নাড়ি নক্ষত্র জানে, অন্যকেও দীক্ষা দিতে পারে। মানুষকে দেখলেই সে চিনতে পারে কে গুণ মেরেছে, কে গুণ মারে নি। এই লাইনের বিদ্যা নিয়ে আমাকে অনেক বুঝিয়েছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কেমন দেখলে পাঅক সেয়াদকে? সে বলল, একদম খাঁটি ভান্তে। কোনো গুণ মারেন নি, কোনো তন্ত্রমন্ত্র নেই। পাঅক সেয়াদ একদম সাদাসিধে ভিক্ষু। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।

স্বামী যোগানন্দের একটা জীবনী পড়েছিলাম “Autobiography of a Yogi”। হিমালয়ে তিনি কীভাবে সাধনা করেছেন, সাধুসন্ন্যাসীরা কিরকম ছিল সেগুলো খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। তাতে যেরকম হিন্দু সাধুসন্ন্যাসীদের কথা লেখা আছে সেগুলোর সাথে এই বিদ্যা চর্চাকারীদের কাজকর্ম মিলে যায়। এরা ধ্যান করে, পূজা করে, সাধনা করে ঠিকই, কিন্তু সেটা নির্বাণের জন্য নয়, নামরূপকে বুঝবে বলে নয়, বিদ্যাধারী হওয়ার জন্যই তাদের ধ্যান, তাদের পূজা, তাদের সাধনা।

যুগ পাল্টে গেছে। একসময় বিদ্যাধরেরা বুদ্ধের শিষ্য হয়েছিল, আর এখন বুদ্ধের শিষ্যরা বিদ্যাধরের শিষ্য হচ্ছে। আপনারা যারা বিদ্যাধর হতে চান তারা তাদের কাছে যেতে পারেন। আমি বুদ্ধের কট্টর অনুসারী, তাই আমি বুদ্ধের পথেই হাঁটব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *