আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

গুরুবাদীদের নিয়ে গবেষণা

ইদানিং কয়েকজন আমাকে জানালো, বার্মার কোন অর্হৎ নাকি বলছে বনভান্তে মরে প্রেতকুলে গেছে। আমি বললাম, কোন অর্হৎ বলছে এ কথা? বার্মাতে জ্যান্ত অর্হৎ আছে বলে তো আজ পর্যন্ত শুনলাম না। যারা ছিলেন তারা তো অনেক বছর আগে পরিনির্বাপিত হয়েছেন। ওরা বলল, আছে, আছে। আপনি ওদের পেজে গিয়ে দেখেন। ছবিসহ আছে।

আমি সাধারণত এগুলো নিয়ে মাথা ঘামাই না। তবুও ওরা অনুরোধ করল যেহেতু, তাই ফেসবুকে ঢুকে দেখলাম ওদের পোস্টগুলো। পড়ে দেখি অবাক কাণ্ড!

১. প্রচুর জাদীর ছবি। স্বর্ণ জাদী, রাম জাদী আর কী কী জাদী। আমার কথা হচ্ছে, জাদী বানানো ভালোই তো। অনেক পুণ্য হয়। তবে পাঅক সেয়াদ বলেন, ভিক্ষুদের টাকাপয়সা গ্রহণ নিষিদ্ধ। তাই ভিক্ষু যদি দায়কের দান করা টাকা গ্রহণ করে জাদী বা বিহার বা ভাবনাকেন্দ্র বানায়, সেখানে ভিক্ষুরা আর যেতে পারে না। সেখানে গিয়ে তারা দিনরাত ভাবনা করলেও ধ্যান লাভ করতে পারে না। ভিক্ষুরা সেরকম স্থানে মরলেও সোজা নরকে। তবে দায়কদের জন্য কোনো সমস্যা নেই।

২. কে কত টাকা দান দিচ্ছে সেগুলোর ছবি। এক্ষেত্রে আমার কথা হচ্ছে, দান দেয়া তো ভালোই। তবে কথা হচ্ছে ভিক্ষু টাকা গ্রহণ করলে নিস্সগ্গিয় পাচিত্তিয় অপরাধ হয়। যেকোনো ভিক্ষুরই সেটা জানার কথা।

৩. এরপরে দেখলাম এক ভিক্ষুর মতো চেহারার ছবি, কিন্তু চুলগুলো লম্বা লম্বা। নিচে বর্ণনা দেয়া আছে, তিনি নাকি কোন এক সেয়াদ। তিনি নাকি আর্যবিদ্যাধর। তার বয়স নাকি ১০০০ বছরের উপরে। তিনি বার্মায় থাকেন না, থাকেন হিমালয়ের কৈলাস পর্বতে।

হুম! প্রথমেই আমার খটকা লাগলো চুলগুলো নিয়ে। চুলগুলো লম্বা লম্বা কেন? কোনো ভিক্ষুর তো কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুল থাকার কথা নয়। তিনি যদি অর্হৎ হয়ে থাকেন তাহলে তো চুল লম্বা রাখবেন না। কারণ যেকোনো অর্হৎ বুদ্ধের নির্দেশিত বিনয়ের প্রতি সাংঘাতিক শ্রদ্ধাশীল হন। জীবন গেলেও বিনয় লংঘন করেন না। কোনো অর্হতের এত লম্বা চুল আছে বলে তো শুনি নি।

এরপরে বিদ্যাধরের ব্যাপারে বলি। আমি জানি বিদ্যা দুধরনের: মহাগান্ধারি বিদ্যা ও চুলগান্ধারি বিদ্যা। এসব বিদ্যা হচ্ছে হীনবিদ্যা। বুদ্ধ কখনোই এগুলো সমর্থন করেন নি।বুদ্ধের আমলে যে দুয়েকজন বিদ্যাধর ছিল তারাও ভিক্ষু হয়ে আর এসব হীনবিদ্যার চর্চা করে নি। বুদ্ধ যেটাকে সমর্থন করেন নি, হীনবিদ্যা বলে ঘৃণা করেন, আরেকজন অর্হৎ সেটাকে সমর্থন করবেন, বিদ্যাধর হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করবেন সেটা কতটুকু যৌক্তিক?

এরপরে বয়সের ব্যাপারে বলি। মানুষের বয়সের একটা সীমা আছে। সেটা হচ্ছে স্বাভাবিক নিয়ম। অর্হতেরা সেই স্বাভাবিক নিয়মগুলো লংঘন করেন না। লোকমুখে কত কী শোনা যায়, অমুক অর্হৎ এখনো বেঁচে আছেন, বুদ্ধশাসন শেষ হলে তবেই পরিনির্বাণ লাভ করবেন ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু সত্যি কথা হচ্ছে সেগুলো ব্যক্তিগত মতামত মাত্র। সেগুলো বিনয়ের সাথে মেলে না, সুত্রের সাথে মেলে না। বুদ্ধ নিজেই বলে গেছেন, যেগুলো বিনয় ও সুত্রের সাথে মেলে না সেগুলো খাঁটি বৌদ্ধধর্ম নয়। সেগুলো নিশ্চয়ই অন্য কোথাও থেকে আমদানী করা হয়েছে।

সে যাই হোক, শেষে আমি এর সুরাহা করতে না পেরে ছবিটি নিয়ে এখানকার ভান্তেদের দেখালাম। এরা তো বার্মিজ ভান্তে। তারা তাদের অর্হৎদেরকে চিনবে না তো কারা চিনবে? কিন্তু কেউই চিনল না। উল্টো আমাকে প্রশ্ন করতে লাগল, কে এই ভিক্ষু? চুল লম্বা লম্বা কেন? কোথায় থাকে? ইত্যাদি। বুঝুন অবস্থা।

৪. এরপরে অনেকগুলো কাহিনী দেখলাম। সেগুলোতে বলা হয়েছে বিপদে আপদে পড়ে অনেক ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি নাকি কোন গুরুভান্তের নাম নিয়ে উদ্ধার পেয়েছে। মানুষের শ্রদ্ধা কোনো যুক্তি মানে না। তাই যারা যার ভক্ত, তারা তাকে স্মরণ করবেই। তাতে আমার বলার কিছু নেই।

কিন্তু বুদ্ধ কী বলে গেছেন? ধজগ্গ সুত্রে বুদ্ধ বলে গেছেন,
অরঞ্ঞে ৰা রুক্খমূলে ৰা সুঞ্ঞাগারে ৰা ভিক্খৰো,
অনুস্সরেথ সম্বুদ্ধং, ভযং তুম্হাকং নো সিযা।
অর্থাৎ অরণ্যে বা গাছতলায় বা নির্জন কোনো ঘরে তোমরা বুদ্ধকে স্মরণ কর, তাহলে তোমাদের ভয় থাকবে না।

কেন ভয় থাকবে না সেটাও বুদ্ধ সেই ধজগ্গ সুত্রে বলে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তথাগতো হি ভিক্খৰে, অরহং সম্মা সম্বুদ্ধো ৰীতরাগো, ৰীতদোসো, ৰীতমোহো, অনুত্রাসী, অপলাযীতি। অর্থাৎ, বুদ্ধ হচ্ছেন অর্হৎ, তাই তিনি লোভহীন, দ্বেষহীন, মোহহীন। তিনি ভয় পান না, পালিয়ে যান না। এরূপ লোভ দ্বেষ মোহহীন ব্যক্তিকে স্মরণ করলেই ভয় কেটে যায়।

তাই কেউ যদি আল্লাহকে স্মরণ করে বিপদ থেকে রক্ষা পায় তাহলে তাতে আমার আপত্তি নেই। কেউ যদি মারকে স্মরণ করে বিপদ থেকে রক্ষা পায় তাতেও আমার আপত্তি নেই। কেউ যদি একটা তালগাছকে স্মরণ করে বিপদ থেকে রক্ষা পায় তাতেও আমার আপত্তি নেই। তবে আমার কথা হলো, বুদ্ধের উপদেশ অনুসারে লোভ দ্বেষ মোহহীন বুদ্ধকেই স্মরণ করুন।

৫. এরপরে দেখলাম রাম বুদ্ধ নিয়ে মাতামাতি। আমি একটু অবাক হলাম। রাম বুদ্ধের আমদানি হলো কোত্থেকে? ত্রিপিটকে নেই, অর্থকথায় নেই। গরু খোঁজা খুঁজেও কোথাও পেলাম না রাম বুদ্ধের কথা। বানানো গপ্পো নাকি? এরপর ফেসবুকের এক পোস্টে দেখলাম একজন দুটো বইয়ের রেফারেন্স দিয়েছে- অনাগতবংশ এবং দশবোধিসত্তের উৎপত্তি কথা। অনাগতবংশ পালিটা পড়লাম। সেটা হচ্ছে অার্যমিত্র বুদ্ধের জীবনী নিয়ে। রাম বুদ্ধের ছিঁটেফোঁটাও দেখলাম না সেখানে। অন্য বইটা আর খুঁজলাম না। কারণ বোধিসত্ত্বদের জীবনী নিয়ে আমি খুব একটা মাথা ঘামাই না। সেগুলো মহাযানীরা করে। আমি নিশ্চিত, সেটা মহাযানীদের কাজকারবার।

উপগুপ্ত ভান্তের কাহিনীও মহাযানীদের আমদানি করা। উপগুপ্ত ভান্তের কাহিনী এসেছে সংস্কৃত ভাষায় রচিত অশোকাবদান এবং বোধিসত্ত্বাবদান কল্পলতা থেকে। এই মহাযানীরা কালক্রমে কত তন্ত্রমন্ত্র ঢোকালো বুদ্ধের নামে। তন্ত্রযান, বজ্রযান, সহজযান ইত্যাদি। প্রাচীন থেরগণ ত্রিপিটকের বিশুদ্ধতা রক্ষার্থে এগুলোকে দূর থেকে বর্জন করতেন। আমিও সেই প্রাচীন থেরদেরকেই অনুসরণ করতে চাই, মহাযানীদের এসব কল্পকাহিনী থেকে দূরে থাকতে চাই। আমার গবেষণা আমি করেছি, আপনারা এবার যা বোঝার বুঝে নিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *