আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

পুনর্জন্মের সত্যিই কি কোনো প্রমাণ আছে, নাকি সব কাল্পনিক?

কিছুদিন আগে কোরা ওয়েবসাইটে একজন প্রশ্ন করেছিল এরকম- পুনর্জন্মের কি সত্যিই কোনো প্রমাণ আছে? আমি কয়েকটা কাহিনী পড়েছি যেখানে শিশুরা স্মরণ করতে পেরেছে যে তারা নাকি টাইটানিকে ছিল, অথবা যুদ্ধ বিমানের পাইলট ছিল, ইত্যাদি। এগুলো কি নিছক গালগল্প নাকি সত্যিই কিছু একটা আছে?

প্রশ্নটা হয়তো সহজ মনে হতে পারে। কিন্তু আপনি যদি মৃত্যু ও পুনর্জন্মের ব্যাপারে যথাযথ না জানেন বা পুনর্জন্মের ব্যাপারে কোনো অভিজ্ঞতা আপনার না থাকে, তাহলে এর সঠিক উত্তর দেয়াটা অসম্ভব। মৃত্যুর পরে কী হয় সেব্যাপারে বিভিন্ন ধর্মে বিভিন্নভাবে বলা আছে। কিন্তু সেগুলোর সত্যতা যাচাই করতে হলে আপনাকে আগে মরতে হবে। এরপর বাদবাকি যা হবার হবে। সেটা দেখতে গিয়ে কোন বোকার মরার খায়েশ আছে বলুন তো।

তবে বৌদ্ধধর্ম এদিক দিয়ে একটু ব্যতিক্রমী। কারণ বৌদ্ধধর্ম আপনাকে এই জীবনেই আপনার অতীত জীবনগুলো দেখার একটা উপায় দেখিয়ে দেয়। সবচেয়ে খুশির ব্যাপার হচ্ছে এর জন্য আপনাকে মরতেও হবে না। একদম জলজ্যান্তভাবে এটার অভিজ্ঞতা নিতে পারবেন হাতে কলমে।

তবে তার জন্য অাপনাকে একটু কষ্ট করে পাঅক ভাবনাকেন্দ্রে আসতে হবে। সেখানে আপনি যখন ধ্যানে অভিজ্ঞ হবেন, আপনার মন যখন কেন্দ্রীভূত হয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠবে, তখন সেই কেন্দ্রীভূত মন তীব্র ও উজ্জ্বল আলো উৎপন্ন করবে। ধ্যানের সেই শক্তিশালী আলোর মাধ্যমে তখন আপনি নিজের দেহকে দেখবেন, মনকে দেখবেন। এরপর আপনি পূর্বজন্মগুলো দেখবেন, কোন জন্মে কীভাবে মারা গিয়েছিলেন, মরার সময়ে কোন কর্ম এসে পরবর্তী জন্মের গতি নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল সব দেখবেন। এভাবে পূর্বজন্মগুলো দেখার পরে আপনাকে ভবিষ্যৎ জন্মগুলোও দেখে নিতে হবে, কোন জন্মে আপনার পরিনির্বাণ লাভ হবে সেটাও দেখে নিতে হবে। তবে আপনাকে জানিয়ে দেয়া হবে যে ভবিষ্যৎ জন্মগুলো হচ্ছে বর্তমান কর্মের উপর ভিত্তি করে পরবর্তী জন্মগুলোর সম্ভাব্য পূর্বাভাস মাত্র। সেগুলো যেকোনো কারণে বদলে যেতে পারে।

এভাবে অতীত ও ভবিষ্যৎ জন্মগুলো দেখার সময়ে আপনি প্রায়ই সেগুলোর ছবি দেখতে পাবেন। কিন্তু আপনাকে সেই ছবিগুলো ভেঙে গুড়ো গুড়ো করে নামরূপ হিসেবে দেখতে উৎসাহিত করা হবে। কারণ ছবিগুলো দেখলে তখন তাতে আপনার লোভ জাগতে পারে বা দ্বেষ জাগতে পারে। আপনি সেগুলোতে অহেতুক জড়িয়ে যান সেটা আমাদের কাম্য নয়।

পাঅক ভাবনাকেন্দ্রের একজন বিখ্যাত ভাবনাগুরু হচ্ছেন রেবত ভান্তে। তিনি বহু বছর আগে থেকে ভাবনা শিখিয়ে আসছেন। তার অনেক বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে একটা বই আছে “দ্য ডিসাইপল উইদিন”। সেখানে তিনি একজন ভাবনাকারী সম্পর্কে বলেছেন যে অতীত জন্মগুলো দেখার স্তরে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু অতীত জন্মগুলো দেখার পরে সে খুব মর্মাহত হলো। রেবত ভান্তে জিজ্ঞেস করলেন কী হয়েছে। তাতে সে কাঁদতে শুরু করল। সে দেখেছিল যে তার এক অতীত জন্মে সে ছিল একটা মালবাহী ঘোড়া। কিন্তু সেই জন্মের আগে সে এক পশ্চিমা দেশে অথবা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশের এক সুন্দরী নারী হিসেবে জন্মেছিল। কিন্তু সেই নারীজন্মে সে খুব ঘোড়দৌড়ের প্রতি অনুরক্ত ছিল। সে ছিল বেশ ধনী মহিলা এবং অনেকগুলো ঘোড়া পালত। তার মৃত্যুর সময়ে ঘোড়ার প্রতি অনুরক্তি তাকে পরবর্তী জন্মে তাকে ঘোড়া হিসেবে জন্ম দিল।

ঘোড়া হয়ে তাকে মালবাহী গাড়ি টেনে তুলতে হতো পাহাড়ের উপরে, আবার নিচে নামিয়ে আনতে হতো। তার সারা দেহ, খুর, পা, পিঠ, গলা ব্যথায় জর্জরিত থাকত। ভাবনার মধ্যে অতীত জন্মগুলো দেখার সময়ে সে এত স্পষ্টভাবে সেই ঘোড়া জন্মের অসহনীয় ব্যথাগুলো অনুভব করেছিল যে সে খুব বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিল!

এভাবে অতীত জন্মগুলো দেখতে হলে আপনার প্রথমে চোখ বন্ধ করে নিজের দেহকে দেখার দক্ষতা অর্জন করতে হয়, এরপর আশেপাশের লোকজনকে দেখার দক্ষতা অর্জন করতে হয়। সেগুলো দেখতে সক্ষম হলে তখন আপনার নিজেকে এক ঘন্টা আগে কোথায় কী করেছেন তা দেখতে হয়, এরপর দুই ঘন্টা আগে … এভাবে পিছিয়ে যেতে যেতে একদম এই জীবনের শুরুতে মায়ের গর্ভে প্রতিসন্ধি গ্রহণের সময়ে দেখতে হয়। শক্তিশালী ও কেন্দ্রীভূত মনোযোগের কারণে মন তখন খুবই উজ্জ্বল হয় এবং সেই আলোয় আপনি সহজেই নিজেকে দেখতে পাবেন। এরপর তার ঠিক আগের জন্মের মৃত্যুর আগমুহুর্তের অবস্থাকে দেখতে হয়, কারণ থেরবাদী বৌদ্ধধর্মমতে, আগের জীবনের মৃত্যুর পরপরই বর্তমান জীবনের শুরু হয়। তাতে কোনো গ্যাপ থাকে না, কোনো দেরী হয় না।

এভাবে মৃত্যুর আগমুহুর্তটি দেখতে গিয়ে একবার এক ভাবনাকারীর কেন জানি শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল বারবার। ভাবনাকারীদেরকে প্রতিদিন রেবত ভান্তের কাছে রিপোর্ট করতে হয় কার কতদূর অগ্রগতি হলো। সেই রিপোর্টিংয়ের সময়ে সে ব্যাপারটা ভান্তেকে জানাল। রেবত ভান্তে তাকে সেটা বারবার চর্চা করতে বললেন যাতে সেটা আরো সহজ হয়, পরিচিত হয়। কিন্তু প্রত্যেকবার সেই মৃত্যুর মুহুর্তটি দেখতে গিয়ে বেচারার সেই একই অভিজ্ঞতা হলো, কেমন যেন শ্বাসকষ্ট। এভাবে চর্চা করতে করতে একসময় সে বুঝতে পারল, সে আসলে শেষ মুহুর্তে পানিতে ডুবে যাচ্ছিল।

তখন ভান্তে তাকে ডুবে যাওয়ার কারণটা দেখতে বললেন। তাই ভাবনাকারী আরো অতীতে ফিরে গেল। দেখল যে সে সেই জন্মে চোর ছিল। লোকজন তাকে হাতেনাতে ধরে গণধোলাই দিয়েছিল। এরপর তাকে একটা বস্তায় ঢুকিয়ে নদীতে ফেলে দিয়েছিল। এভাবে সে পানিতে ডুবে মারা গিয়েছিল। গণপিটুনির কারণে তার কপাল বেশ ভালোমতো কেটে গিয়েছিল। এভাবে সে এই জন্মেও একটা কপালে ঠিক সেই জায়গায় একটা জন্মগত চিহ্ন নিয়ে জন্মেছিল।

কিন্তু চুরির মতো এমন খারাপ কর্ম করা সত্ত্বেও কীভাবে সে আবার মানুষ হয়ে জন্মাল? তার তো সোজা নরকে যাওয়া উচিত ছিল, নয় কি? তাই ভান্তে আবার বললেন যেন সে তার মৃত্যুর মুহুর্তের মনকে বিশ্লেষণ করে দেখে সেখানে মৃত্যুর সময়ে কোন কর্ম এসে হাজির হয়েছে। ভাবনাকারী তখন আবার ভাবনায় মন দিল। মৃত্যুর আগমুহুর্তের নামরূপকে বিশ্লেষণ করে সে দেখল সেখানে ভেসে উঠেছে ভিক্ষুসঙ্ঘকে পিণ্ডদানের ছবি। সেই পুণ্যকর্মই তাকে মানবজীবনের টিকেট ধরিয়ে দিয়েছে আরেকবার। পাপকর্মগুলো আপাতত তোলা রইল নিকট ভবিষ্যতের জন্য।

এভাবেই আমরা বৌদ্ধরা পুনর্জন্মের তত্ত্বকে ইহজীবনেই পরীক্ষাগারে প্রমাণ করে দেখতে পারি।

এখন আপনার যদি এব্যাপারে কোনো অভিজ্ঞতা না থাকে, তাহলে এই কাহিনীগুলোকে আপনার গাজাখুরি বলে মনে হবে। কিন্তু সত্য সবসময় সাধারণজনের আওতার বাইরে থাকে। কেবল অসাধারণ ব্যক্তিরা তাদের ধৈর্য্য ও অধ্যবসায় দিয়ে পুনর্জন্মজনিত অবিদ্যার অাবরণকে ভেদ করতে সক্ষম হন। আমাদের সবারই অতিসত্বর এমন জ্ঞান ও দর্শন লাভ হোক, এই প্রার্থনা করি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *