আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

দুই মিলিয়ন ডলারের শিক্ষা

একটা ঘটনার কথা মনে হয় আপনাদেরও জানা উচিত। তাই লিখতে বসলাম। ঘটনাটা ঘটেছে এখানে এই মহাগন্ধয়োন বিহারে কয়েকদিন আগে। এখানকার এক বার্মিজ শ্রামণের সাথে ফেসবুকে কোন এক বিদেশীর যোগাযোগ হয়। সেই বিদেশী বলে যে, সে দুই মিলিয়ন ডলার দান করতে ইচ্ছুক এখানকার কোনো একটা এনজিওকে। শ্রামণ যদি চায় তাহলে সেগুলো সে শ্রামণকে পাঠাতে পারে। এরপরে শ্রামণ তার বিবেচনা মোতাবেক কোনো একটা এনজিওকে সেগুলো দিয়ে দিতে পারবে। খুবই সহজ সরল প্রস্তাব। শ্রামণ রাজি হয়ে গেল। কিন্তু দুই মিলিয়ন ডলার তো সহজ কথা নয়। সেগুলো রিসিভ করতে হলে কিছু খরচাপাতি দরকার আছে, নয় কি? তাই বিদেশিটা বলল, কাস্টমস ও অন্যান্য আইনি প্রসেসিংয়ের জন্য কিছু টাকার দরকার আছে। আপনারা ১০০০ ডলার পাঠান প্রসেসিংয়ের জন্য।

উত্তম প্রস্তাব। শ্রামণটার তো আর এত টাকা নেই। ১০০০ ডলার মানে মায়ানমারে প্রায় সাড়ে ১১ লাখ চ্যাট (মায়ানমারের টাকার নাম ক্যাট, উচ্চারণ হয় চ্যাট)। এত টাকা সে পাবে কোত্থেকে? তাই এবার সে দুয়েকজন ইংরেজি জানা ভিক্ষুর কাছ থেকে সাহায্য প্রার্থনা করল। এরমধ্যে একজন হচ্ছেন আমাদের বার্মিজ শিক্ষক।

আমাদের বার্মিজ শিক্ষক বয়সে তরুণ, কিন্তু গুণে বৃদ্ধ হয়ে বসে আছেন। তিনি পাঅকের ভাবনাকোর্স কমপ্লিট করে তবেই ত্রিপিটক শিক্ষা করতে এখানে এসেছেন। আপনাকে বুঝতে হবে যে, পাঅকের ভাবনাকোর্স কম্প্লিট করা যার তার কাজ নয়। অষ্ট সমাপত্তি কাকে বলে এবং কত প্রকার ও কী কী সেগুলো হাতে কলমে শিখে নিয়ে, বিভিন্ন টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তবেই তারা কোর্স কমপ্লিট বলে স্বীকৃতি দেয় এবং পরিয়ত্তি শিখতে পাঠায়। তাই তার দায়কেরা তার প্রতি ভীষণ শ্রদ্ধাশীল। তিনি তার এক দায়ককে বলতেই সে দিয়ে দিল সাড়ে আট লাখ টাকা। বাকিটা বোধ হয় আরেকজন যোগাড় করে দিল। এভাবে দুয়েকদিন তারা সেটা নিয়ে ব্যাংকে দৌড়াদৌড়ি করল।

দুয়েকদিন অপেক্ষার পরে বিদেশির জবাব এল। এবার সে দাবি করল আরো ষোল লাখ টাকা। এবার এরা বুঝল তারা এক প্রতারকের খপ্পরে পড়েছে। তাই তারা থানায় গিয়ে ব্যাপারটা জানাল। থানার পুলিশ ব্যাংক একাউন্ট চেক করে ইয়াঙ্গুনের এক বার্মিজ মহিলাকে ধরল। বার্মিজ মহিলাটা এক বিদেশির দোভাষী হিসেবে কাজ করত। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে বিদেশিটার নামধাম নেয়া হলো, কিন্তু বিদেশিটা বিপদ আঁচ করে পালিয়ে গেল।

এই হচ্ছে ঘটনা। এতো সাধারণ প্রতারণার ঘটনা। কত এরকম ঘটে। কিন্তু টাকাগুলো যে মার গেল। সেটাও ভান্তের টাকা নয়, দায়কের টাকা! দায়কটা তো মহাক্ষতিগ্রস্ত হলো। সেগুলো তো যেকোনো উপায়ে উদ্ধার করা উচিত। আমি তাই আমাদের বার্মিজ শিক্ষক ভান্তেকে বললাম, আপনারা থানায় মামলা করুন না। পুলিশ বিদেশিটাকে ধরে পিটিয়ে টাকাগুলো ফেরত দিতে বলুক। কিন্তু ভান্তে বললেন, সেটা করলে সমস্যা আছে। আমরা চোরটাকে ধরতে বলি নি। কেবল ঘটনাটার কথা পুলিশের কাছে জানিয়েছিলাম। তারাই এরপর যা করার করেছে। এখন আমরা যদি টাকা ফেরত দিতে বলি সেটা পারাজিকার সমতুল্য হয়ে যাবে। আমি তো শুনে অবাক। এটা তো আমি ভাবি নি। অন্যায় করে নিজেদের জিনিস আরেকজন ছিনিয়ে নিল, এখন সেটাও দাবি করা যাবে না, এ কোন ধরনের যুক্তি?

কিন্তু ভান্তে বললেন, এখানকার প্রাচীন সেয়াদগণ এজাতীয় ব্যাপারে খুবই সতর্ক ছিলেন। চুরি করার আগে হয়তো চুরি করতে নিষেধ করা যায়, কিন্তু চুরি হলে সেটা চোরের জিনিস হয়ে যায়। তাই সেটা আর কোনো ভিক্ষুই দাবি করতে পারে না। চোরটাকে ধরে যদি চোরাই মাল ফেরত দিতে বাধ্য করা হয় তাহলে ভিক্ষুটির পারাজিকা আপত্তি হয়।

ভান্তে একটি ঘটনার কথা জানালেন। একবার এক সেয়াদ সন্ধ্যাবেলায় হাঁটাহাঁটি করতে গিয়ে দেখলেন নারিকেল গাছে এক চোর উঠে নারিকেল চুরি করছে। চোরটা টের পেয়ে লাফ দিয়ে গাছ থেকে নেমে নারিকেলগুলো ফেলেই দৌড় দিয়ে পালিয়ে গেল। সেয়াদ অনেকবার বললেন, দাঁড়াও, যেও না। কিন্তু চোর কি আর সেকথা শোনে। কথায় আছে না, চোরের মন পুলিশ পুলিশ। ভান্তে হয়েছে বলেই কি বিশ্বাস করা যায়? ধরলে প্যাঁদানি দেবে না কোনো গ্যারান্টি আছে।

এদিকে চোরটা পালিয়ে গেলে হইচইয়ের শব্দ শুনে বিহারের কপ্পিয়কারক ছুটে আসল। সে চোরের ফেলে যাওয়া নারিকেলগুলো কুড়িয়ে নিয়ে বিহারে রেখে দিতে চাইল। কিন্তু সেয়াদ বললেন, এগুলো চোরের জিনিস, চোরেরই অধিকার আছে। আমরা এগুলো পরিভোগ করতে পারি না। তুমি বরং কাল সকালে গ্রামে গিয়ে চোরটাকে খুঁজে নিয়ে এগুলো দিয়ে এসো।

তাই দায়কদায়িকাগণ, বিদেশিদের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। টাকাপয়সা খুব সতর্কতার সাথে লেনদেন করুন। আর ভিক্ষুগণ জোর করে কোনোকিছু কেড়ে নেয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। জোর জবরদস্তি করে কারো জিনিস কেড়ে নেয়াটা আর যেই করুক বৌদ্ধভিক্ষুরা করতে পারে না।

3 thoughts on “দুই মিলিয়ন ডলারের শিক্ষা

  1. বন্দনা ভান্তে। বুদ্ধের মাতা মহামায়া বুদ্ধের (সিদ্ধার্থ) জন্মের সাত দিনের মাথায় কেন মৃত্যুবরণ করেছিলেন? বুদ্ধদের মাতারা কি সাতদিনের বেশি বাঁচে না? উনার পূর্ব জন্মের কি হেতুতে বুদ্ধের মাতা হয়েও অকাল মৃত্যুবরণ করেছিলেন?

    1. বুদ্ধগণের মাতাগণ সবসময় সাতদিন পর্যন্ত বাঁচেন। সেটা অকালে মরণ নয়। আপনি হয়তো মনে করেছেন বুদ্ধের মা যুবতী ছিলেন। তিনি কিন্তু চল্লিশোর্ধ ছিলেন। সঠিক হিসাবটা আমার মনে নেই। তবে প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি ছিলেন। সাধারণ হিসেবে হয়তো আমাদের মনে হতে পারে, বুড়ো না হয়ে মরলেই সেটা অকাল মরণ। বৌদ্ধধর্মমতে সেটা সেরকম নয়। আয়ুক্ষয়, কর্মক্ষয়, এবং উভয়ক্ষয়ে মরণ হয়। যে যেরকম আয়ু নিয়ে জন্মায় সেটা ফুরালেই যদি তার মরণ হয় তাহলে সেটাকে আর যাই হোক অকাল মরণ বলার কথা নয়।

  2. বন্দনা ভান্তে। অনাগত দশ বুদ্ধ সম্পর্কে যদি বিস্তারিত কিছু লিখতে তাহলে আমাদের মতো ধর্ম পিপাসু উপাসকদের জন্য পরম উপকার হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *