আমার ফেসবুকের লেখাগুলো – My facebook Writings

অর্হতের মৃতদেহ কি পচে যায়?

আগের একটা পোস্টে আমি লিখেছিলাম “পরিনির্বাণের আগে অধিষ্ঠান না করলে অর্হতের দেহ সাধারণ মৃতদেহের মতোই পচে গলে যায়।” তাতে দুএকজন প্রশ্ন তুলেছিল, অর্হতের দেহ তো বিশুদ্ধ, তাহলে তা পচে গলে যাবে কেন? প্রশ্নটায় শুরু থেকেই ধরে নেয়া হয়েছে অর্হতের দেহ বিশুদ্ধ। আমি ভাবি, সত্যিই কি তাই? অর্হতের চিত্ত বিশুদ্ধ, কিন্তু দেহ কীভাবে বিশুদ্ধ হয়? সব্বে সত্তা আহারট্ঠিতিকা। সকল প্রাণি আহারের উপর নির্ভরশীল। অর্হতেরও তো বেঁচে থাকার জন্য খাওয়ার প্রয়োজন হয়। সেই খাওয়া হচ্ছে কবলীকার আহার। হজমের মাধ্যমে সেই আহারের কিছু অংশ মলমূত্রে পরিণত হয়, কিছু অংশ পুষ্টি হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে দেহের মধ্যে, তখন সেটা ৩২ প্রকার অশুচিতেই পরিণত হয়। অর্হত হলেও তো মলমূত্র ত্যাগ করতে হয়। তাহলে সেই অশুচিময় দেহকে কীভাবে বিশুদ্ধ বলা যায়?

এ তো গেল অর্হতের দেহ বিশুদ্ধ বা অবিশুদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে আমার কথা। এরপরে কথা হচ্ছে, সত্যিই কি অর্হতের দেহ পচেগলে যায়? ত্রিপিটক ও অর্থকথায় বহু ঘটনা আছে যেখানে অর্হতের শরীর দাহ করার পরে ধাতু পাওয়ার কথা জানা যায়। কিন্তু দাহ না করলে কী হয়? এখন তো মৃতদেহ সংরক্ষণের কত কী টেকনিক হয়ে গেছে। কিন্তু সংরক্ষণের ব্যবস্থা যদি না করা হয় তাহলেও কি সেই দেহ অবিকৃত থাকে? নাকি পচে যায়? এর কোনো সদুত্তর মেলে না। আমি তাই এখানকার পরিয়ত্তিধর ভান্তেদের কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করেছি। তাদেরও কেউ কেউ বলে, পচে না, শুকিয়ে যায় মাত্র। কেউ কেউ বলে, পচে যায়। ত্রিপিটকে কোনো সুনির্দিষ্ট রেফারেন্স না থাকায় এক্ষেত্রে তাদেরও নানাজনের নানামত হয়ে গেছে। তবে এক ভান্তে আমাকে নিচের কাহিনীটা বলেছেন:

দক্ষিণ মায়ানমারে পাথেইন নামের একটা শহর আছে, যা ছাতার জন্য বিখ্যাত। সেখানে অনেক আগে কড়া বিনয় পালনকারী এক সেয়াদ ছিলেন। তার মৃত্যুর পর তাকে একটা কফিনে ঢুকিয়ে সমাধিস্থ করা হয়। আপনাদের জানানো উচিত, মায়ানমারের অনেক জায়গায় মৃতদেহ দাহ করা হয় না, বরং মৃতদেহগুলো কফিনে ঢুকিয়ে কবরে দেয়া হয়। পাঅক ভাবনাকেন্দ্রে বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে এমন শ্মশান রয়েছে, সেখানে আছে অনেকগুলো কবর, দেখতে একদম মুসলমানদের কবরের মতো। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম, আমার ধারণা ছিল বৌদ্ধরা সবাই মৃতদেহ দাহ করে।

সে যাই হোক, সেই সেয়াদকে সমাধিস্থ করার পরে সেই বিহারে আরেকজন সেয়াদ আসলেন। মৃত্যুর পরে তাকেও সমাধিস্থ করা হলো। তারপরে আরেকজন সেয়াদ আসলেন। তাকেও সমাধিস্থ করা হলো একইভাবে। এরপর বহু বছর কেটে গেল। একদিন একটা ভূমিকম্পে বিহারটা এতই ক্ষতিগ্রস্ত হলো যে একদম নতুন করে সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দিল। সেটা সংস্কারের কাজ শুরু হলো। প্রয়াত সেয়াদদের সমাধিসৌধগুলোও আবার নতুন করে সংস্কারের কাজ শুরু হলো। কিন্তু সেগুলো সংস্কার করতে গিয়ে দেখা গেল প্রথম ও দ্বিতীয় সেয়াদের মৃতদেহ পচে যায় নি, গলে যায় নি। কফিনগুলো সব পোকায় খেয়েছে, খেতে খেতে একদম দেহের কাছাকাছি চলে এসেছে, কিন্তু দেহের কোনো ক্ষতি করে নি। দেহগুলো অক্ষতই রয়েছে। কেবল তৃতীয় সেয়াদের দেহটা পচে গলে মাটির সাথে মিশে গিয়েছিল। এরপর আর সেগুলোকে সমাধিস্থ করা হলো না, লোকজন যাতে সেগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে পারে তার ব্যবস্থা করা হলো। আমি জিজ্ঞেস করেছি, এখন গেলেও কি দেখা যাবে সেই অর্হৎ ভান্তেদের মৃতদেহগুলোকে? উত্তরে জেনেছি এখনো আছে সেগুলো, আগের মতোই অটুট।

পাঅক ভাবনাকেন্দ্রে থাকার সময়েও একবার এক বিহারে বেড়াতে গিয়ে দেখেছিলাম বিখ্যাত এক সেয়াদের মৃতদেহকে গ্লাসের কফিনে রাখা হয়েছে, বনবিহারে বনভান্তের দেহটাকে যেভাবে রাখা হয়েছে সেভাবে।

তাই অনেকেই একটা ধারণা পোষণ করে, অর্হতের দেহে পচন ধরে না। ত্রিপিটক ও অর্থকথায় এব্যাপারে নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ নেই। তবুও বাস্তবের এই ঘটনা জানার প্রেক্ষিতে আগের পোস্টটা একটু সংশোধন করে নিয়েছি, সংশোধিত কথাগুলো ব্র্যাকেটের মধ্যে দিয়ে দিলাম।

(কাজেই শুধুমাত্র বিদর্শন ভাবনা করে অর্হৎ হয়েছেন যিনি তাকে এপদ্ধতিতেও চেনা যাবে না। আর যিনি অভিজ্ঞালাভী অর্হৎ তিনি যদি পরিনির্বাণের আগে অধিষ্ঠান করে না যান, তাহলে তার মৃতদেহও দেখাবে সাধারণ পৃথকজনের মতো, কিন্তু পার্থক্য হচ্ছে সেটা পচে গলে যাবে না। )

দয়া করে আপনারাও এব্যাপারে বুঝেশুনে কথা বলবেন। বিষয়টা সবার কাছে শেয়ার করার অনুরোধ রইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *